জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে ট্রাম্পের নতুন শুল্কের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
যুক্তরাষ্ট্রের যেসব বাণিজ্য অংশীদার জোরপূর্বক শ্রম বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের ওপর নতুন শুল্ক বসাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে হুমকি দিয়েছেন, তা আধুনিক দাসত্ব মোকাবিলায় খুব একটা কাজে আসবে না। উল্টো এতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী সংগঠন ও মানবাধিকার গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন এই বাণিজ্য পদক্ষেপে ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক বসানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, এসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) দপ্তরের এই পরিকল্পনা এসেছে ‘সেকশন ৩০১’ তদন্তের ভিত্তিতে, যা অনৈতিক বাণিজ্য চর্চা মোকাবিলার জন্য চালানো হয়। এর মাধ্যমে ট্রাম্প তাঁর আগের জরুরি শুল্ক আবার চালু করারই চেষ্টা করছেন বলে মনে করা হচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট গত ফেব্রুয়ারিতে বাতিল করে দেন।
তবে বাণিজ্য ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় থাকা শিশুশ্রম, জোরপূর্বক শ্রম এবং অন্যান্য শোষণমূলক কর্মপরিবেশের সমস্যার সমাধানে এই উদ্যোগের প্রভাব হবে সীমিত।
ডিজিটাল শিপমেন্ট যাচাই প্ল্যাটফর্ম পাবলিকানের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রাম বেন তসিয়োন বলেন, ‘এই নতুন পদক্ষেপের মূল বিষয়টির সঙ্গে জোরপূর্বক শ্রমের খুব বেশি সম্পর্ক নেই। এটি মূলত শুল্ক বসানোর নতুন একটি অজুহাত মাত্র।’
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সর্বশেষ বৈশ্বিক হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে ২ কোটি ৭৬ লাখ মানুষ জোরপূর্বক শ্রমের শিকার, যা ২০১৬ সালের তুলনায় প্রায় ২৭ লাখ বেশি। এসব শ্রমের প্রায় অর্ধেকই বেসরকারি খাতের রপ্তানিমুখী শিল্পে ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে উৎপাদন, নির্মাণ, কৃষি ও মৎস্য এবং খনিশিল্প।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বিশেষভাবে নজর কেড়েছে।
ইউএসটিআরের প্রতিবেদনে ইইউর জোরপূর্বক শ্রমবিধির সমালোচনা করা হয়েছে। ২০২৭ সালের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই বিধিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মের তুলনায় আরও কঠিন মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য ভিত্তি প্রমাণ করতে হবে।
ইউরোপীয় কমিশন (ইসি) বলেছে, ট্রাম্পের শুল্ক বসানোর এই সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক। একই সঙ্গে তারা গত বছর ওয়াশিংটনের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্য চুক্তির প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। ওই চুক্তির আওতায় অধিকাংশ ইউরোপীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কহার সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ওয়াক ফ্রি বলেছে, নিজেদের অর্থনৈতিক সক্ষমতার তুলনায় জোরপূর্বক শ্রম মোকাবিলায় জি-২০–ভুক্ত কোনো দেশই যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না। সংগঠনটির মতে, আধুনিক দাসত্বের মধ্যে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যার বিচারে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের একটি।
ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের (আইসিসি) উপমহাসচিব অ্যান্ড্রু উইলসন বলেন, শুল্ক বসানোর এই ‘খামখেয়ালি’ বা ‘ইচ্ছামাফিক’ ধরন উদ্বেগের কারণ। তিনি বলেন, ‘যদি এই শুল্ক বসানোর উদ্দেশ্য আধুনিক দাসত্বের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা হয়, তাহলে এই পদক্ষেপের কোনো অর্থ হয় না।’
অ্যান্ড্রু উইলসন আরও বলেন, ইইউর পরিকল্পিত ব্যবস্থা কার্যকর হলে তা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবস্থার চেয়ে আরও বড় আকারের হবে। কারণ, এটি আমদানি, ইইউর ভেতরে বিক্রি হওয়া পণ্য এবং ইইউ থেকে রপ্তানি—সবকিছুকেই অন্তর্ভুক্ত করে।
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, ট্রাম্পের পরিবর্তনশীল বাণিজ্যনীতির কারণে সরবরাহ শৃঙ্খলে খরচ বেড়েছে এবং অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
শিক্ষামূলক খেলনা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান লার্নিং রিসোর্সেসের প্রধান নির্বাহী রিক ওলডেনবার্গ বলেন, জোরপূর্বক শ্রম মোকাবিলার নীতিকে বাণিজ্যিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করা ঠিক নয়। তাঁর মতে, দেশগুলো জোরপূর্বক শ্রমের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে প্রতিযোগিতার কারণে নয়, বরং এটি অনৈতিক বলে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের করপোরেট জবাবদিহিবিষয়ক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হেলেন দে রেঙ্গার্ভ বলেন, এই শুল্ককাঠামো বাস্তবে পরিবর্তন আনবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তাঁর আশঙ্কা, এটি রাজনৈতিক প্রতিরোধ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে এবং জোরপূর্বক শ্রম বন্ধের লক্ষ্যেই উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।
How did this article make you feel?
Related Articles
বিশ্ব
লেবাননে হামলার বিষয়ে ইসরায়েলকে কড়া হুঁশিয়ারি দিলেন ভ্যান্স
Jun 19, 2026 · 1 min
1 shared tag
বিশ্ব
ইরানের ওপর থেকে নৌ অবরোধ তুলে নিল যুক্তরাষ্ট্র
Jun 19, 2026 · 1 min
1 shared tag
বিশ্ব
মিয়ানমারের উপকূলে দুই নৌকাডুবি, ৫ শতাধিক রোহিঙ্গার প্রাণহানির আশঙ্কা: জাতিসংঘ
Jul 16, 2026
বিশ্ব
খামেনির দাফনের বিশাল আয়োজন, যুক্তরাষ্ট্রকে কী বার্তা দিতে চায় ইরান
Jul 04, 2026
0 Comments
No comments yet. Be the first to share your thoughts!