ইরানের ওপর থেকে নৌ অবরোধ তুলে নিল যুক্তরাষ্ট্র
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইরানের ওপর থেকে নৌ অবরোধ তুলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, এই চুক্তির বিষয়ে তাঁর ভিন্ন মত রয়েছে। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘মরিয়া হয়েই’ এই চুক্তিতে সই করেছেন।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তারা জানিয়েছে, ‘প্রেসিডেন্টের নির্দেশ অনুযায়ী’ এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে অবরোধ কার্যকরের মার্কিন তৎপরতা বন্ধ হলো।
এ বিষয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেন, শুরুতে তিনি এই চুক্তির পক্ষে ছিলেন না। তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের আশ্বাসের পর তিনি এতে সম্মতি দেন।
এই চুক্তিতে বেশ কিছু বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সব ফ্রন্টে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া।
চুক্তির পক্ষে কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি বলেন, চুক্তির শর্তগুলো পূরণ না করা পর্যন্ত ইরান কোনো অর্থ পাবে না বা নিষেধাজ্ঞা থেকেও ছাড় পাবে না।
সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) অনুযায়ী, ইরান এখনই কোনো সুবিধা পাবে না। এর আগে তাদের প্রমাণ করতে হবে যে তারা ‘পুরোপুরি নিয়ম মেনে চলবে এবং নিজেদের আচরণ বদলাবে’। এই প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে—ইরানকে তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস করতে হবে। পাশাপাশি ওই অঞ্চলে তাদের মদদপুষ্ট গোষ্ঠীগুলোকে আর কোনো অর্থ দেওয়া চলবে না।
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার প্রাথমিক চুক্তিটি কার্যকর হয়েছে। এর ফলে পরবর্তী ৬০ দিন দুই পক্ষের মধ্যে আরও আলোচনা চলবে। ‘কারিগরি আলোচনার’ জন্য তিনি শিগগিরই সুইজারল্যান্ডে যেতে পারেন বলেও জানান।
তবে তিনি কবে যাবেন, তা নির্দিষ্ট করে জানাননি। ভ্যান্স বলেন, ইরান ‘খুব একটা সহজ দেশ নয়’। তাই এই সফরটি ঠিক কবে হবে, তা তাঁরা বোঝার চেষ্টা করছেন।
এদিকে শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হওয়ার কথা থাকলেও পরে জানা যায়, অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়েছে। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান বিবিসিকে জানিয়েছে, চুক্তিটি ইতিমধ্যে দূর থেকেই সই হয়ে গেছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, পরবর্তী আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা সুইজারল্যান্ডে বৈঠকে বসবেন।
এরই মধ্যে ইরানের সংবাদমাধ্যমে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির একটি লিখিত বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে তিনি বলেছেন, যেসব কর্মকর্তা এই চুক্তি নিয়ে কাজ করেছেন, তাঁরা ‘আন্তরিক উদ্বেগ ও সদিচ্ছা’ থেকেই এ পর্যন্ত এসেছেন। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প এটি বাস্তবায়নের জন্য ‘মরিয়া হয়ে সব ধরনের প্রভাব খাটিয়েছেন’।
বিস্তারিত কিছু না জানিয়ে খামেনি বলেন, এ বিষয়ে তাঁর ‘ভিন্ন মত’ রয়েছে। ভবিষ্যতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ‘সরাসরি আলোচনা’ হতে পারে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এর অর্থ এই নয় যে তাঁরা ‘শত্রুর অবস্থান মেনে নিচ্ছেন’।
এই চুক্তির বিষয়ে এবারই প্রথম মুখ খুললেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হন তাঁর বাবা ও পূর্বসূরি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। এর পরই মূলত আঞ্চলিক যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। বাবার মৃত্যুর পর মার্চ মাসে দায়িত্ব নেন মোজতবা খামেনি। এর পর থেকে তাঁকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
খামেনির বিবৃতির সরাসরি কোনো জবাব দেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, লেবাননে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহসহ ‘সব ফ্রন্টে’ দ্রুত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। সেই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এই আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তাদের প্রতিশ্রুতি ধরে রাখবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এদিকে চুক্তি সই হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় ওয়াশিংটন তাঁদের সঙ্গে ‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’ দাঁড়িয়েছিল। ইসরায়েলের মন্ত্রিসভার সদস্যরা এই চুক্তির তীব্র সমালোচনা করার পরই নেতানিয়াহু এ মন্তব্য করলেন।
এর জবাবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, যাঁরা এই চুক্তির সমালোচনা করছেন, তাঁদের ‘জেগে ওঠা উচিত এবং বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা উচিত’। তিনি আরও বলেন, ‘আমি যদি ইসরায়েল সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকতাম, তবে পুরো বিশ্বে টিকে থাকা আমার একমাত্র শক্তিশালী মিত্রকে এভাবে আক্রমণ করতাম না।’
ইসরায়েলের মন্ত্রিসভার ঠিক কারা চুক্তির সমালোচনা করেছেন, তা জেডি ভ্যান্স সরাসরি জানাননি। তবে বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন–গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের নাম উল্লেখ করেছেন।
ভ্যান্স বলেন, ‘তাঁদের প্রতি আমার প্রশ্ন হলো—আপনাদের আসল প্রস্তাবটা কী? আপনারা মাত্র ৯০ লাখ মানুষের একটি দেশ। জাতীয় নিরাপত্তার সব সমস্যা শুধু মানুষ মেরেই সমাধান করা যায় না।’
যুদ্ধবিরতি বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া এই চুক্তি ১৪টি মূল বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এর মধ্যে রয়েছে ‘সব ফ্রন্টে’ সংঘাতের অবসান, অবরোধ প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া এবং ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। এ ছাড়া ইরানের ‘পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের’ জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের (৩০ হাজার কোটি ডলার) একটি তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। তবে এই তহবিলে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অর্থ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চুক্তির ঘোষণা আসার পরও ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ একে অপরের ওপর হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার লেবাননে হামলায় তিনজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ইসরায়েলের দাবি, হিজবুল্লাহর সঙ্গে তাদের এই সংঘাত ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের চেয়ে আলাদা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই চুক্তির শর্তগুলো মানতে রাজি হয়নি হিজবুল্লাহ।
How did this article make you feel?
Related Articles
ইরান যুদ্ধের আড়ালে আজারবাইজানে ইসরায়েলি সেনার গোপন আস্তানা
Jun 06, 2026 · 1 min
2 shared tags
জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে ট্রাম্পের নতুন শুল্কের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
Jun 05, 2026 · 1 min
1 shared tag
বাংলাদেশকে ২৮৬০ জনের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের অনুরোধ ভারতের, ফেরতের প্রস্তুতি
Jun 07, 2026 · 1 min
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়: নেপথ্যে যে ৫ কারণ
May 07, 2026 · 1 min