শিগগির পদত্যাগ করতে পারেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন, আলোচনায় কে
রাষ্ট্রপতির কাছে বিএনপির বার্তা পৌঁছানোর বিষয়ে অবগত একটি সূত্রের সঙ্গে বুধবার রাতে কথা হয়
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শিগগিরই পদত্যাগ করতে পারেন। দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানিয়েছে, শারীরিক অসুস্থতার কথা জানিয়ে তিনি সরে দাঁড়াতে পারেন।
সরকার ও বিএনপির সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে পদত্যাগের অনুরোধ জানিয়ে ইতিমধ্যে বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর জায়গায় নতুন কে আসতে পারেন, তা নিয়েও উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে।
রাষ্ট্রপতির কাছে বিএনপির বার্তা পৌঁছানোর বিষয়ে অবগত একটি সূত্রের সঙ্গে বুধবার রাতে কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই সূত্র নিশ্চিত করে, খুব দ্রুতই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সম্ভাবনা রয়েছে।
পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়েও ক্ষমতায় থাকা বিএনপির উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিতে দায়িত্বে থাকা একজন সচিবের নাম সম্ভাব্য পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে হঠাৎ আলোচনায় এসেছে। যদিও এর আগে এই পদের জন্য বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও আবদুল মঈন খানসহ কয়েকজনের নাম আলোচনায় ছিল।
মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার সাময়িকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব সামলাবেন। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। এই নতুন রাষ্ট্রপতির মেয়াদেই পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ফলে কে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন, সে বিষয় রাজনৈতিকভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অবশ্য রাষ্ট্রপতি পদে আলোচনায় থাকা বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একজন সচিবের নাম হঠাৎ আলোচনায় আসার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি একদমই কিছু জানি না। আর এমন কিছু ঘটলে পদ খালি হওয়ার পর অনেক নাম আলোচনায় আসবে, সেটাই স্বাভাবিক।’
তবে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের বিষয়ে গতকাল পর্যন্ত বঙ্গভবন বা সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কথা বা ঘোষণা পাওয়া যায়নি। কিন্তু বঙ্গভবনের একটি সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি নিজে তাঁর অধীনে থাকা কর্মীদের শিগগিরই বঙ্গভবন ছেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ওই সূত্রের মতে, পদত্যাগের পর তিনি কিছুদিন বিশ্রামে থাকবেন এবং চিকিৎসার জন্য বিদেশেও যেতে পারেন।
সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশ্যে সই করা চিঠির মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারেন। এছাড়া ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ খালি হলে কিংবা তাঁর অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পদত্যাগ, মৃত্যু বা পদচ্যুতির কারণে রাষ্ট্রপতির পদ খালি হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়। সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ক্ষমতায় থাকা বিএনপির সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত ব্যক্তিই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার কথা।
এদিকে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্বে থাকা একজন সচিবের নাম সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেশি আলোচনায় আসছে। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থা—এসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই তাঁর নাম সামনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে দল ও সরকারের নীতিনির্ধারকেরা আরও আলোচনা করবেন।
ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, নতুন রাষ্ট্রপতিকে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে সম্ভাব্য রাজনৈতিক চাপও সামলাতে হবে। তাই সরকার, বিরোধী দল ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। এরপর সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনসহ রাজনৈতিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ধাপে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. সাহাবুদ্দিন।
গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন ছাত্রনেতারা। তাঁর পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাওসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছিল জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক বিভিন্ন সংগঠন। তবে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে সরানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। এর ফলে রাষ্ট্রপতি ও সরকারের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভিন্নতা তৈরি হয়। মো. সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তাদের মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও সরকার গঠনের পর বিএনপি তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে সরানোর পথে হাঁটেনি। সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতির ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ছিল। তবে সরকার বা বিএনপি প্রকাশ্যে কখনো তাঁর পদত্যাগ দাবি করেনি।
সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি করা নিয়ে আওয়ামী লীগের সময়েই নানা আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ছিল। পরবর্তীতে বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম গ্রুপের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার বিষয়টিও সামনে আসে। দুদকের দায়িত্ব পালন শেষে তিনি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান এবং এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব সামলান। তখন এই দুটি ব্যাংকের মালিক ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলম। ব্যাংক দুটিতে সে সময় সবচেয়ে বড় লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
ইসলামী ব্যাংকের পদে থাকা অবস্থাতেই মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেয় ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগ সরকার। ব্যাংক থেকে পদত্যাগ করে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল থেকে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে রয়েছেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন শেখ রেহানা মিলে সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে আওয়ামী লীগের ভেতরে আলোচনা ছিল। তখন এই রাষ্ট্রপতিকে এস আলমের প্রতিনিধি হিসেবেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা করা হতো।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্রপতি নিজে থেকে দায়িত্ব ছাড়েন কি না, তা দেখার জন্য ক্ষমতায় থাকা দলটি কিছুটা সময় নিয়েছে। সম্প্রতি তাঁকে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের মনোভাবের কথা জানানো হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করলে গণ-অভ্যুত্থান ও পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আরেকটি বড় পরিবর্তন ঘটবে। একই সঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি প্রথমবারের মতো নিজেদের পছন্দের কাউকে রাষ্ট্রপতি করার সুযোগ পাবে। পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নতুন রাষ্ট্রপতির মেয়াদেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকায় পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ কৌতূহল রয়েছে।
How did this article make you feel?