পদ্মা ট্রিবিউন | বাংলা নিউজ পেপার
বাংলাদেশ রাজনীতি বিশ্ব বাণিজ্য মতামত খেলা বিনোদন চাকরি জীবনযাপন ভিডিও

গোপালগঞ্জে সর্তক প্রশাসন, স্বাভাবিক জনজীবন

২০২৫ সালের ১৬ জুলাই এনসিপির ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচি কেন্দ্র করে দফায়-দফায় সংঘর্ষে ৫ জন নিহত হয়।

প্রতিনিধি গোপালগঞ্জ
গোপালগঞ্জ শহরের চৌরঙ্গী থেকে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায়
গোপালগঞ্জ শহরের চৌরঙ্গী থেকে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে গোপালগঞ্জে হামলা ও সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হওয়ার বর্ষপূর্তিতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এই বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। তবে জেলায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রয়েছে।


আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টায় শহরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম সংলগ্ন পুনর্নির্মাণাধীন ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে’ শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে জেলা প্রশাসন। এ সময় গোপালগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. কে এম বাবর, জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান, পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লাহ এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক শরীফ রফিকুজ্জামানসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিএনপির নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।


গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লাহ জানান, গোপালগঞ্জকে অন্য জেলার থেকে আলাদাভাবে দেখা হচ্ছে না। এখানকার মানুষ শান্তিপ্রিয় হওয়ায় আজকের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে।


২০২৫ সালের ১৬ জুলাই এনসিপির ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে পাঁচজন নিহত হন।


সেদিন এনসিপির সমাবেশস্থল, জেলা প্রশাসকের বাসভবন, পুলিশ সুপারের কার্যালয় ও জেলা কারাগারে হামলা-ভাঙচুর চালানো হয়। এ ছাড়া সমাবেশস্থলে অগ্নিসংযোগ এবং শহরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম সংলগ্ন জুলাই স্মৃতিস্তম্ভটি ভাঙচুর করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারির পাশাপাশি কারফিউ জারি করেছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এনসিপির নেতারা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আশ্রয় নেন এবং পরে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যানে (এপিসি) করে কঠোর নিরাপত্তায় ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এরপর সন্ধ্যা ৬টার দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

১৬ জুলাইকে কেন্দ্র করে গোপালগঞ্জে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

গত বছরের ওইসব সহিংসতার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে গোপালগঞ্জ সদর, কোটালীপাড়া, কাশিয়ানী ও টুঙ্গিপাড়া থানায় পৃথক ১৫টি মামলা দায়ের করেছে। এসব মামলায় ১ হাজার ১৫ জন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীর নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৪ হাজার ৭৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত পুলিশ ৪৪১ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে।


এদিকে ঘটনার এক বছর পূর্তিতে গোপালগঞ্জের সাধারণ মানুষের মনে চাপা আতঙ্ক বিরাজ করলেও জনজীবন স্বাভাবিক রয়েছে। তবে নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে কি না, তা নিয়ে খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা গেছে।


শহরের ভ্যানচালক জমির উদ্দিন (৫৫) বলেন, আমরা দিন আনি দিন খাই। গত বছরের গণ্ডগোলের পর অনেক দিন ভ্যান চালাতি পারি নেই। সংসার চালাতি কষ্ট হইছে। ইবার আবার ১৬ জুলাই পুলিশ, বিজিবি দেখতিছি। আবার কিছু হবে নাকি? ভয় করে।


একই ধরনের আশঙ্কার কথা জানিয়ে দিনমজুর এনাম শেখ বলেন, ১৬ জুলাইর মতন অবস্থা আমরা চাইনে। ভয়ে ১৫/২০ দিন বাড়ি ঘুমাতি পারি নেই। এহন আবার ১৬ জুলাই আইছে। ফেসবুকে মিছিল দেখতিছি। কি হয় জানিনে। তয় আমরা অশান্তি চাইনে।


বাসশ্রমিক দেলদার হোসেন বলেন, নিরাপত্তা দিতি বিজিবি আইছে। পুলিশ কাজ করতিছে। আমাগে গাড়ি চালানোর কাজ আমরা চালায় যাতি চাই। এ জুন্নি সরকারের কাছে নিরাপত্তা চাচ্ছি। নাশকতা না হলি ভাল হয়। তারপরও অজানা আতংকের মধ্যি আছি।

গোপালগঞ্জ লেকপাড়ে নির্মিতব্য জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হচ্ছে। ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

এদিকে, ১৬ জুলাইকে ‘গণহত্যা দিবস’ আখ্যা দিয়ে এবং আহত-নিহতদের স্মরণে গত মঙ্গলবার ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার তিলছড়ায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা।


এ সময় মিছিল প্রতিহত করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। মিছিলকারীরা রামদিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. নান্নান খাকীর মোটরসাইকেল ভাঙচুর ও তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়।


পরে এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। কাশিয়ানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, “মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা ও হামলার ঘটনায় এর মধ্যেই ছাত্রলীগের ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”


এদিকে এই দিনটিকে ঘিরে জেলার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বুধবার থেকে গোপালগঞ্জে ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবি সদস্যরা ইতিমধ্যে টহল শুরু করেছেন। তাঁদের সঙ্গে র‌্যাব ও পুলিশ যৌথভাবে টহল দিচ্ছে। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। পাশাপাশি সাদা পোশাকেও দায়িত্ব পালন করছেন বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা।


গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান বলেন, “১৬ জুলাই ও ১৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি মোতায়েনের জন্য অনুরোধ করে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। সেই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতেই গোপালগঞ্জে ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।”


জেলা প্রশাসক আরও জানান, শুধু এই দুই দিনই নয়, জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিরতি দিয়ে দিয়ে বিজিবি মোতায়েন করা হবে বলে আইনশৃঙ্খলা ও মনিটরিং কমিটিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এটি জেলা প্রশাসনের রুটিন কাজেরই অংশ।


গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লাহ বলেন, গত বছরের ১৬ জুলাইয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ১৫টি মামলা হয়েছে। তদন্ত শেষে এসব ঘটনায় যারা প্রকৃত জড়িত, তাদের বিরুদ্ধেই আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। কোনো নির্দোষ ব্যক্তিকে হয়রানি করা হবে না।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন

How did this article make you feel?

Related Articles

0 Comments

No comments yet. Be the first to share your thoughts!

Leave a Comment

Moderated — may take a moment.