বিদ্যুতের বাড়তি দামে চাপে হিমাগার, লোকসানে আলুচাষি
হিমাগারে সংরক্ষিত আলুর ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষকেরা ভাড়া কমানোর দাবি জানিয়েছেন
জুন থেকে কার্যকর হওয়া বিদ্যুতের নতুন হারের কারণে হিমাগার পরিচালনার ব্যয় বেড়েছে বলে দাবি করেছেন মালিকেরা। তাঁদের ভাষ্য, ওই সময় বৃষ্টি ও তুলনামূলক শীতল আবহাওয়ার কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার কিছুটা কম ছিল। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে ব্যয় আরও বাড়ত। একই কারণে জুলাইয়ে বিদ্যুৎ বাবদ খরচ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু ফয়জুন নাহার হিমাগার নয়, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেশের প্রায় সব হিমাগারেই পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অন্যদিকে, হিমাগারে সংরক্ষিত আলুর ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষকেরা ভাড়া কমানোর দাবি জানিয়েছেন। হিমাগার মালিকেরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও ব্যাংকঋণের সুদ বেড়ে যাওয়ায় পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মালিকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় হিমাগারের ‘যৌক্তিক’ ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তবে দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক অবস্থা এবং আলুচাষি ও ব্যবসায়ীদের লোকসানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ভাড়া বাড়ানোও বাস্তবসম্মত নয়। তাই হিমাগার খাত টিকিয়ে রাখতে বিদ্যুতের দামে বিশেষ ছাড় বা প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত কৃষকের ওপর পড়লে তাঁদের লোকসান আরও বাড়বে।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, জুনে কার্যকর হওয়া নতুন বিদ্যুৎ হারের ফলে হিমাগারের বিদ্যুৎ ব্যয় গড়ে প্রায় ১৮ শতাংশ বেড়েছে। আগে অফ-পিক সময়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ছিল ১৩ টাকা ৬২ পয়সা। এখন তা বেড়ে হয়েছে ১৬ টাকা ৬ পয়সা। আর পিক সময়ে প্রতি ইউনিটের দাম ৯ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ১১ টাকা ৫৬ পয়সা।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছর দেশে ১ কোটি ১৭ লাখ ৮৫ হাজার টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে দেশে হিমাগার রয়েছে ৪০২টি। এর বাইরে অ-হিমায়িত মডেল ঘর রয়েছে ৭০৩টি। চলতি মৌসুমে এসব হিমাগার ও মডেল ঘরে মোট ৩৩ লাখ ৯০ হাজার ৫৭ টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। এটি মোট উৎপাদনের ২৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এর মধ্যে ২৪ লাখ ৪৪ হাজার ১৪৮ টন খাওয়ার জন্য এবং ৯ লাখ ৪৫ হাজার ৯১০ টন বীজ হিসেবে রাখা হয়েছে।
গত বছর কৃষি বিপণন অধিদপ্তর হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া কেজিপ্রতি ৬ টাকা ৭৫ পয়সা নির্ধারণ করেছিল। চলতি মৌসুমেও সেই হার কার্যকর রয়েছে। কৃষকেরা এই ভাড়া বেশি বলে মনে করছেন। তবে হিমাগার মালিকদের দাবি, এ হারেও তাঁদের লোকসান হচ্ছে।
বিসিএসএর দাবি, ১০ হাজার টন ধারণক্ষমতার একটি হিমাগারে ব্যাংকের সুদসহ কিস্তি এবং নতুন বর্ধিত বিদ্যুতের দাম হিসাব করলে প্রতি কেজি আলুর পেছনে ব্যয় হয় ৭ টাকা ১১ পয়সা। এর সঙ্গে কর্মীদের বেতন-ভাতা, অ্যামোনিয়া গ্যাস, পিচ্ছিলকারক পদার্থসহ (লুব্রিক্যান্ট) অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ এবং ‘যৌক্তিক লভ্যাংশ’ যোগ করলে কেজিপ্রতি ভাড়া দাঁড়ায় ৯ টাকা ৬২ পয়সা। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁরা ভাড়া ৬ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৭ টাকা করার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে বিসিএসএর সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, সুদসহ ব্যাংকের কিস্তি ও বিদ্যুৎ বাবদ প্রতি কেজি আলুর পেছনে তাঁদের ব্যয় ৭ টাকা ১১ পয়সা। শ্রমিকসহ অন্যান্য খরচ যোগ করলে তা ৯ টাকা ৬২ পয়সায় দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে হিমাগার মালিকদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। কৃষক ও আলু ব্যবসায়ীদের লোকসান এবং দেশের আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ভাড়া বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। আবার মালিকেরাও নিজেদের লোকসান বহন করতে পারছেন না।
মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, অন্যান্য কৃষিশিল্পের মতো হিমাগারেও বিদ্যুতে মূল্যছাড় দিতে হবে এবং কৃষকদের সহযোগিতা করতে হবে। তা না হলে মালিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাঁরা হিমাগার বন্ধ করে দিলে কৃষকের ক্ষতি আরও বাড়বে।
সংকট সমাধানে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, ক্ষতিগ্রস্ত আলুচাষিদের সরকারি প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন। হিমাগারের বিদ্যুতে ছাড় দিতে হবে। একই সঙ্গে হিমাগারকে কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে ঘোষণা করে স্থাপন ও পরিচালন ব্যয়ের জন্য জাতীয় রাজস্ব বাজেট থেকে ৬ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা যেতে পারে। ওই অর্থ থেকে ৪ থেকে ৫ শতাংশ সুদে হিমাগার স্থাপন ও পরিচালনার জন্য ঋণ দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি।
এ ছাড়া উদ্বৃত্ত আলু রপ্তানিতে উৎসাহ দিতে প্রণোদনা ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করা এবং হিমাগারের ঋণের কিস্তি তিন মাস পর পর পরিশোধের (ত্রৈমাসিক) পরিবর্তে বছরে একবার পরিশোধের সুযোগ দেওয়ারও দাবি রয়েছে।
হিমাগার মালিকেরা বলছেন, শুধু বিদ্যুতের দাম নয়, শ্রমিকের মজুরি ও বিভিন্ন উপকরণের মূল্যও বেড়েছে। এতে সামগ্রিকভাবে ব্যবসায়ীদের ব্যয় বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে এই চাপ আলুচাষিদের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিসিএসএর সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরীর প্রতিষ্ঠান ফয়জুন নাহার হিমাগার লিমিটেডের ধারণক্ষমতা ১০ হাজার টন। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, ২০২৫ সালে সব ধরনের খরচ মিলিয়ে ব্যয় হয়েছিল ৬ কোটি ৪৬ লাখ ৪৮ হাজার ৮২৯ টাকা। চলতি বছর ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ কোটি ৭৩ লাখ ৭৩ হাজার ২৭৪ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ব্যয় বেড়েছে ১ কোটি ২৭ লাখ ২৪ হাজার ৪৪৫ টাকা বা ১৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
এদিকে, টানা দুই বছর ধরে আলুতে লোকসান করছেন কৃষকেরা। হিমাগার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে লোকসানের কারণে প্রায় দুই লাখ টন আলু হিমাগার থেকে কৃষকেরা নেননি। সংগঠনটির হিসাবে, আলু উৎপাদনে কৃষকের খরচ পড়ে কেজিপ্রতি ১৪ থেকে ১৬ টাকা। এর সঙ্গে হিমাগার ভাড়া, পরিবহন, বস্তাসহ অন্যান্য ব্যয় যোগ হলে খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২৫ টাকা। অথচ হিমাগার ফটকে কৃষকেরা প্রতি কেজি আলু ১৫ থেকে সর্বোচ্চ ১৭ টাকায় বিক্রি করছেন।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রতি কেজি আলুর পাইকারি দাম ছিল ১৮ থেকে ২১ টাকা। খুচরা বাজারে তা বিক্রি হয়েছে ২৫ থেকে ২৮ টাকায়। একই দিন মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে প্রতি কেজি আলুর খুচরা দাম ছিল ২৫ থেকে ৩০ টাকা। এতে কৃষকের লোকসান আরও বাড়ছে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে হিমাগারের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়ার বিকল্প নেই।
রংপুরের পীরগাছা উপজেলার কল্যাণী ইউনিয়নের তালুক গ্রামের আলুচাষি আব্দুর রহিম বলেন, নিজের জমিতে উৎপাদিত এবং কেনা মিলিয়ে তিনি চার হাজার বস্তা আলু হিমাগারে রেখেছিলেন। প্রতি বস্তায় ছিল ৬৫ কেজি। এর মধ্যে দুই হাজার বস্তা ১৫ ও ১৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছেন। কিন্তু উৎপাদন, হিমাগারসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে তাঁর প্রতি কেজি আলুর ব্যয় হয়েছে ২৩ টাকা। এখন বিক্রি করলে কেজিপ্রতি ৭ থেকে ৮ টাকা লোকসান হবে। গত বছরও তাঁকে লোকসান গুনতে হয়েছিল।
বদরগঞ্জ উপজেলার শাহজালাল হিমাগারের ব্যবস্থাপক সুভাস মুখার্জি বলেন, সরকার নির্ধারিত কেজিপ্রতি ৬ টাকা ৭৫ পয়সা ভাড়াই তাঁরা নিচ্ছেন। এবার হিমাগার ফটকে ডায়মন্ড ও স্টারিক জাতের আলু প্রতি কেজি ১৬ থেকে ১৭ টাকা এবং টিপিএস জাতের আলু ১৪ থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দেশে বছরে প্রায় ৯০ লাখ টন আলুর চাহিদা রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, সর্বশেষ মৌসুমে দেশে প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। আগের মৌসুমে উৎপাদন ছিল ১ কোটি ১৫ লাখ টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদিত হয়েছিল ১ কোটি ৬ লাখ টন। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রতিবছরই আলুর উদ্বৃত্ত থাকছে। এর ফলে কৃষকেরা লোকসানে পড়ছেন। এ পরিস্থিতিতে আলুর বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানো এবং সরকারি সহায়তা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন কৃষি অর্থনীতিবিদেরা।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আলুচাষিরা বছরের পর বছর লোকসান করছেন। এ সমস্যা সমাধানে সরকার দুটি উদ্যোগ নিতে পারে। প্রথমত, কৃষকের হিমাগার ভাড়ার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি বা ভাগ করে নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, আলুচাষিদের মূল্য সহায়তা দিয়ে তাঁদের লোকসান থেকে রক্ষা করা যেতে পারে। এতে কৃষকেরা ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি আলু চাষে আগ্রহী হবেন।
তিনি আরও বলেন, হাঁস-মুরগির খামারসহ অন্যান্য কৃষিশিল্প বিদ্যুতে মূল্যছাড় পাচ্ছে। হিমাগারকেও একই সুবিধা দিতে হবে। এতে কৃষকের ওপর সংরক্ষণ ব্যয়ের চাপ কমবে এবং হিমাগার মালিকেরা ক্ষতির মুখে পড়বেন না।
সার্বিক বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, বাংলাদেশ কৃষিভিত্তিক দেশ। সরকার সব সময় কৃষিকে অগ্রাধিকার দেয়। হিমাগারে আলু সংরক্ষণের খরচ সরকার, কৃষক ও হিমাগার মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করেই নির্ধারণ করা হয়। আগামী মৌসুম শুরুর আগেই কৃষক প্রতিনিধি ও হিমাগার মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি সমাধানে আসার চেষ্টা করা হবে। এতে কৃষক ও হিমাগার মালিক—উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হবে।
How did this article make you feel?