শিল্প উৎপাদনশীলতায় পিছিয়ে পড়ছে দেশ
সূচকটি বিভিন্ন দেশের শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি ক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়।
শিল্প উৎপাদন বাড়লেও প্রযুক্তিগত উন্নতি ও বেশি দামের পণ্য তৈরির ক্ষেত্রে প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। দেশের মোট রপ্তানির প্রায় পুরোটাই শিল্পে তৈরি পণ্য হলেও তার বড় অংশই সাধারণ বা কম প্রযুক্তির। ফলে কারখানা বাড়লেও প্রযুক্তিভিত্তিক উৎপাদন ও দক্ষতায় বড় পার্থক্য থেকে গেছে। জাতিসংঘের শিল্প উন্নয়ন সংস্থার (ইউনিডো) নতুন শিল্প সক্ষমতা সূচকেও বাংলাদেশের এই কাঠামোগত দুর্বলতার কথা উঠে এসেছে। সূচকটি বিভিন্ন দেশের শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি ক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়।
ইউনিডোর ২০২৬ সালের তালিকা অনুযায়ী বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামকে ‘উদীয়মান শিল্পনির্ভর দেশ’ হিসেবে রাখা হয়েছে। যেসব দেশ শিল্পে টানা উন্নতি করছে, তাদেরই রাখা হয় এই তালিকায়। ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এই দেশগুলোতে মাথাপিছু শিল্প উৎপাদন গড়ে বছরে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ করে বেড়েছে।
তবে একই তালিকায় থাকা অন্য দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। ইউনিডোর সূচক অনুযায়ী, ১৫৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬২তম। বাংলাদেশের প্রাপ্ত নম্বর দশমিক শূন্য ৪৩, যেখানে বিশ্বজুড়ে গড় নম্বর দশমিক শূন্য ৬৪। সেখানে ভিয়েতনামের অবস্থান ৩০, ইন্দোনেশিয়া ৩৮ ও ভারত ৩৯তম। তিনটি দেশের নম্বরই বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি।
সামগ্রিক শিল্প সক্ষমতার পাশাপাশি প্রযুক্তির দিক থেকেও পিছিয়ে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে দেশের মোট শিল্প উৎপাদনের ৯৩ দশমিক ৬ শতাংশই এসেছে কম প্রযুক্তির খাত থেকে। মাঝারি প্রযুক্তির অবদান ছিল মাত্র ১ দশমিক ৯ শতাংশ এবং উন্নত প্রযুক্তির অবদান মাত্র দশমিক ৮ শতাংশ। মাঝারি ও উন্নত প্রযুক্তির পণ্য তৈরির দিক থেকে বাংলাদেশ ১১৭তম স্থানে রয়েছে। আর এসব পণ্য রপ্তানির দিক থেকে অবস্থান ১৪৬তম।
রপ্তানির ক্ষেত্রেও অন্য দেশগুলোর চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। মোট রপ্তানি পণ্যের মধ্যে মাঝারি ও উন্নত প্রযুক্তির পণ্যের হার বাংলাদেশে মাত্র ৩ শতাংশ। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ায় এই হার ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ, ভারতে ৪১ দশমিক ৫ ও ভিয়েতনামে ৫৪ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ, সমপর্যায়ের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ এখনো কম প্রযুক্তির পণ্যের ওপরই বেশি নির্ভরশীল।
গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বাড়লেও প্রযুক্তিভিত্তিক উৎপাদনে তেমন অগ্রগতি হয়নি। আমাদের মূল প্রতিযোগী ভিয়েতনামে কম প্রযুক্তির পণ্যের ব্যবহার কমে উচ্চ প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনো সাধারণ প্রযুক্তিতেই আটকে আছে। এ কারণেই আমরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছি।’
তবে ভিয়েতনামের এগিয়ে যাওয়ার পেছনে বিদেশি বিনিয়োগ বড় ভূমিকা রেখেছে জানিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘ভিয়েতনাম বিদেশি বিনিয়োগমুখী দেশ, তাই তাদের প্রযুক্তি দ্রুত উন্নত হয়েছে। তবে আমাদের রপ্তানি শিল্প গড়ে উঠেছে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের হাত ধরে। তারপরও আমাদের রপ্তানি আয়ে তৈরি পোশাক খাতের অবদান বাড়ছে। উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে হলে প্রযুক্তির উন্নয়ন ও নীতিতে পরিবর্তন দরকার। ঢালাও সুবিধা না দিয়ে যেসব খাতে বেশি দামের পণ্য তৈরি হয়, যেমন হালকা প্রকৌশল ও চিপ বা সেমিকন্ডাক্টর খাত, সেগুলোতে বিনিয়োগকারীদের আলাদা সহায়তা দেওয়া উচিত। এতে পণ্যে বৈচিত্র্য আসবে এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়বে।’
তবে মোট রপ্তানিতে শিল্পজাত পণ্যের হারের দিক থেকে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। দেশের মোট রপ্তানির ৯৯ দশমিক ৬ শতাংশই শিল্পে তৈরি পণ্য। সেখানে ভিয়েতনামে এই হার ৯২ দশমিক ৮ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ৮০ দশমিক ৪ ও ভারতে ৬৭ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের মূল সমস্যা শিল্প কারখানার অভাব নয়, বরং এই কারখানাগুলোকে প্রযুক্তিভিত্তিক ও বেশি দামি পণ্য তৈরির উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে না পারা।
মাথাপিছু শিল্প উৎপাদনের ক্ষেত্রে অবশ্য কয়েকটি প্রতিযোগী দেশের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে শিল্প খাতে মাথাপিছু উৎপাদন ছিল ৬১৫ ডলার, যা ভারতের ৩৪১ ডলার ও ভিয়েতনামের ৫১৮ ডলারের চেয়ে বেশি। তবে ইন্দোনেশিয়ায় এটি ছিল ৮১৫ ডলার। সূচকে মাথাপিছু শিল্প উৎপাদনের শক্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। এই খাতে বাংলাদেশের নম্বর দশমিক শূন্য ২০, যেখানে বৈশ্বিক গড় দশমিক শূন্য ৭৪।
ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশকে চীন ও তুরস্কের সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। যদিও বৈশ্বিক সক্ষমতা তালিকায় চীন দ্বিতীয় ও তুরস্ক ২৬তম স্থানে রয়েছে।
শিল্প খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতে, শিল্প সক্ষমতা বাড়াতে এবং উৎপাদন খরচ কমাতে প্রয়োজন টানা নীতিগত সহায়তা, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ, রাজনৈতিক পরিবেশ শান্ত থাকা, নিরাপত্তা, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ঋণ ও অবকাঠামোগত খরচ কমানো। তবে এসবের পাশাপাশি উৎপাদন বাড়াতে প্রয়োজন সময়োপযোগী প্রযুক্তিগত শিক্ষা ও দক্ষ কর্মী তৈরি করা।
প্রযুক্তি ও দক্ষতার অভাব নিয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, ‘বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে, কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেই পর্যায়ে যেতে পারেনি। আমাদের পড়াশোনা ও কাজের দক্ষতা বর্তমান শিল্পের চাহিদার সঙ্গে মিলছে না। শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যেও কোনো সংযোগ তৈরি হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘উপযুক্ত দক্ষ কর্মী তৈরি করা গেলে হালকা প্রকৌশলসহ বিভিন্ন খাতের চিত্র অন্যরকম হতে পারত। দক্ষ লোকের অভাবে এসব খাতের বিকাশ আটকে আছে এবং আমরা কম দামি পণ্যেই পড়ে আছি। পোশাক খাতকেও এখন দামি পণ্য তৈরির দিকে যেতে হবে। আর সেজন্য দক্ষ লোকবলের কোনো বিকল্প নেই।’
প্রযুক্তি ও দক্ষতায় পিছিয়ে থাকার এই বাস্তবতার মধ্যেই পালিত হবে জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস। এ উপলক্ষে শিল্প মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘দেশের উৎপাদন বাড়াতে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে একই কাজের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে হবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাধ্যমে নতুন প্রকল্প নেওয়ার আগেই অন্যান্য প্রকল্পের সঙ্গে এর কাজের মিল আছে কি না, তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে যাচাই করা দরকার।’
নতুন প্রকল্প কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে যাচাই করার ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘সফটওয়্যার ব্যবহার করে একই কাজে অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ে প্রকল্প চলছে কি না তা আগে থেকে জানা গেলে সরকারের খরচে দক্ষতা বাড়বে এবং অপচয় বন্ধ হবে।’
বিশ্ববাজারের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘উৎপাদন বাড়ানো শুধু বাংলাদেশের নয়, সব দেশের জন্যই জরুরি। কোনো পণ্য কম খরচে ও ভালোভাবে তৈরি করতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজার অন্য দেশ দখল করে নেবে। তাই নিজেদের বাজার ধরে রাখার পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেশীয় শিল্পকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার যোগ্য হতে হবে। দেশের শিল্প ও অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ কর্মী ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে।’