পদ্মা ট্রিবিউন | বাংলা নিউজ পেপার
বাংলাদেশ রাজনীতি বিশ্ব বাণিজ্য মতামত খেলা বিনোদন চাকরি জীবনযাপন ভিডিও

রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা, দখল ও চাঁদাবাজিতে আঁতাত

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় এমন চিত্রই উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় বিএনপি, জামায়াত, এমনকি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের একাংশের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা
দখল-হামলা-চাঁদাবাজি
দখল-হামলা-চাঁদাবাজি | গ্রাফিক্স: পদ্মা ট্রিবিউন

রাজনীতিতে তাদের পথচলা আলাদা। কিন্তু জমি দখল, চাঁদাবাজি, হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটে যেন মিলেমিশে একাকার। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় এমন চিত্রই উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় বিএনপি, জামায়াত, এমনকি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের একাংশের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।


মিরপুর-১ নম্বর সেকশনে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি কেন্দ্র ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুরের ঘটনায় পৃষ্ঠপোষক ও মূল হোতাদের পাশাপাশি গ্রেপ্তার কয়েকজনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ ও গোয়েন্দারা। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় এই দুটি হামলার ঘটনা ছিল সবচেয়ে আলোচিত।


রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি কেন্দ্রে হামলার ঘটনায় পৃষ্ঠপোষক ও মূল হোতা হিসেবে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ও বিএনপির সাবেক নেতা মো. হানিফ মিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করেছেন। এর আগে বিএনপি, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও শ্রমিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জনকে বহিষ্কার করা হয়।


দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে রাড্ডায় হামলার কথা উল্লেখ করা হয়নি। বহিষ্কারের কারণ হিসেবে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।


স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের ছয় নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে সাইফুল ইসলাম খোকন (৪৮) শাহ আলী থানা বিএনপির সদস্য এবং মো. আলম (৫৩) শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক দলের সভাপতি। গ্রেপ্তার হন শাহ আলী থানা যুবদলের বহিষ্কৃত সভাপতি নূর আলমও। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও চাঁদাবাজির অভিযোগে চার বছর আগে তাঁকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়।


এ ছাড়া গ্রেপ্তার রাকিব আহমেদ শাহ আলী থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক, সারোয়ার আলম ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের সহসভাপতি এবং সাজ্জাদ হোসেন মিশু শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা কমিটির সদস্য। পুলিশ জানিয়েছে, সাজ্জাদ নিজেকে কথিত জাতীয়তাবাদী সাইবার দলের ঢাকা জেলা শাখার সহসভাপতি হিসেবেও পরিচয় দেন। সারোয়ারকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।


অন্যদিকে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ও ‘নিউগিনি প্রপার্টিজ’ ভবনে হামলার ঘটনায় ছাত্রলীগ কর্মী ও জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় পুলিশ ও গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের মধ্যে কুষ্টিয়া-২ আসনের সংসদ সদস্যের (এমপি) জামাতা মিজানুর রহমানকেও (৫৯) গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। তিনি মামলার এজাহারভুক্ত আসামি।


এ ছাড়া গ্রেপ্তার শাহ আলম অনিক মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সাবেক ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মী হিসেবে পরিচিত।


সম্প্রতি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, অপরাধীদের কোনো দলীয় বা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনার সুযোগ নেই। অপরাধীর একমাত্র পরিচয় হলো সে একজন অপরাধী।


রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে হামলার ঘটনায় ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় গ্রেপ্তার আসামিদের অনেকেরই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তথ্য যাচাই ও ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।


তিনি বলেন, কেউ অপরাধ করলে এবং তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেলে দলীয় কোনো পরিচয় দেখা হচ্ছে না। যে-ই হোক, অপরাধ প্রমাণিত হলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই।


বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল শনিবার বলেন, বিএনপি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নতুন করে পাওয়ার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বারবার সতর্ক করেছেন। দলের ব্যানারে অপরাধ করলে কোনো ছাড় নয়।


তিনি বলেন, দলের অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সংস্কৃতি নতুন নয়, এটি অনেক পুরোনো। অতীতেও দলের নেতা-কর্মী ও মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।


আলাল বলেন, একজন সংসদ সদস্য, যিনি বিএনপির একজন নেত্রী হিসেবে জীবনে অনেক ত্যাগ করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পদত্যাগের নির্দেশনা দিয়ে তাঁকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে এবং অপরাধীর খাতায় তাঁর নাম লিখে দেওয়া হয়েছে।


বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, অপরাধের অনেক ধরন আছে—সামাজিক, আইন, নৈতিকতা ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অপরাধ। অপরাধের ধরন বুঝে তাঁদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। দলীয় পদ-পদবি ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে কোনো ছাড় দেওয়া হয় না, শাস্তি অবধারিত।


এসব ঘটনায় বিবৃতি দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট ৩৮ নাগরিক। হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং তাঁদের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।


বিবৃতিতে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক ও পেশিশক্তির প্রভাব খাটিয়ে ভূমি দখল, বাড়িঘরে হামলা ও চরাঞ্চলের খাসজমি দখলের মতো ঘটনা ঘটছে। এতে জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।


অন্যদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর সশস্ত্র হামলা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। হামলায় জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।


সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবি জানায়, একই সঙ্গে দল ও অঙ্গসংগঠনের সহিংস কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা।


টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, হামলার শিকার গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হামলাকারী, তাঁদের সহযোগী ও পৃষ্ঠপোষকদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।


সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, দলীয় ব্যানারে পেশিশক্তির ব্যবহার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির কারণে এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটছে। সরকার কোনোভাবেই এ দায় এড়াতে পারে না।


তিনি বলেন, বিশেষ করে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি কেন্দ্র ও সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে এবং অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন। দেশের সংগঠিত বেশিরভাগ বড় অপরাধের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, রাজনৈতিক নেতা ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আঁতাতের মাধ্যমে এসব অপরাধ হয়ে থাকে।


তাঁর ভাষ্য, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়েছে। কেউ বিদেশে থাকার সুযোগে অন্যের সম্পত্তি দখল করতে হামলা, গোলাগুলি, ভাঙচুর ও লুটের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, দেশে আইনের শাসন নেই এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিষ্ক্রিয়, যা এখন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এসব সমস্যার সমাধান রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকেই আসতে হবে।রাজনীতিতে তাদের পথচলা আলাদা। কিন্তু জমি দখল, চাঁদাবাজি, হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটে যেন মিলেমিশে একাকার। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় এমন চিত্রই উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় বিএনপি, জামায়াত, এমনকি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের একাংশের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।


মিরপুর-১ নম্বর সেকশনে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি কেন্দ্র ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুরের ঘটনায় পৃষ্ঠপোষক ও মূল হোতাদের পাশাপাশি গ্রেপ্তার কয়েকজনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ ও গোয়েন্দারা। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় এই দুটি হামলার ঘটনা ছিল সবচেয়ে আলোচিত।


রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি কেন্দ্রে হামলার ঘটনায় পৃষ্ঠপোষক ও মূল হোতা হিসেবে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ও বিএনপির সাবেক নেতা মো. হানিফ মিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করেছেন। এর আগে বিএনপি, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও শ্রমিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জনকে বহিষ্কার করা হয়।


দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে রাড্ডায় হামলার কথা উল্লেখ করা হয়নি। বহিষ্কারের কারণ হিসেবে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।


স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের ছয় নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে সাইফুল ইসলাম খোকন (৪৮) শাহ আলী থানা বিএনপির সদস্য এবং মো. আলম (৫৩) শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক দলের সভাপতি। গ্রেপ্তার হন শাহ আলী থানা যুবদলের বহিষ্কৃত সভাপতি নূর আলমও। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও চাঁদাবাজির অভিযোগে চার বছর আগে তাঁকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়।


এ ছাড়া গ্রেপ্তার রাকিব আহমেদ শাহ আলী থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক, সারোয়ার আলম ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের সহসভাপতি এবং সাজ্জাদ হোসেন মিশু শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা কমিটির সদস্য। পুলিশ জানিয়েছে, সাজ্জাদ নিজেকে কথিত জাতীয়তাবাদী সাইবার দলের ঢাকা জেলা শাখার সহসভাপতি হিসেবেও পরিচয় দেন। সারোয়ারকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।


অন্যদিকে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ও ‘নিউগিনি প্রপার্টিজ’ ভবনে হামলার ঘটনায় ছাত্রলীগ কর্মী ও জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় পুলিশ ও গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের মধ্যে কুষ্টিয়া-২ আসনের সংসদ সদস্যের (এমপি) জামাতা মিজানুর রহমানকেও (৫৯) গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। তিনি মামলার এজাহারভুক্ত আসামি।


এ ছাড়া গ্রেপ্তার শাহ আলম অনিক মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সাবেক ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মী হিসেবে পরিচিত।


সম্প্রতি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, অপরাধীদের কোনো দলীয় বা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনার সুযোগ নেই। অপরাধীর একমাত্র পরিচয় হলো সে একজন অপরাধী।


রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে হামলার ঘটনায় ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় গ্রেপ্তার আসামিদের অনেকেরই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তথ্য যাচাই ও ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।


তিনি বলেন, কেউ অপরাধ করলে এবং তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেলে দলীয় কোনো পরিচয় দেখা হচ্ছে না। যে-ই হোক, অপরাধ প্রমাণিত হলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই।


বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল শনিবার বলেন, বিএনপি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নতুন করে পাওয়ার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বারবার সতর্ক করেছেন। দলের ব্যানারে অপরাধ করলে কোনো ছাড় নয়।


তিনি বলেন, দলের অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সংস্কৃতি নতুন নয়, এটি অনেক পুরোনো। অতীতেও দলের নেতা-কর্মী ও মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।


আলাল বলেন, একজন সংসদ সদস্য, যিনি বিএনপির একজন নেত্রী হিসেবে জীবনে অনেক ত্যাগ করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পদত্যাগের নির্দেশনা দিয়ে তাঁকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে এবং অপরাধীর খাতায় তাঁর নাম লিখে দেওয়া হয়েছে।


বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, অপরাধের অনেক ধরন আছে—সামাজিক, আইন, নৈতিকতা ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অপরাধ। অপরাধের ধরন বুঝে তাঁদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। দলীয় পদ-পদবি ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে কোনো ছাড় দেওয়া হয় না, শাস্তি অবধারিত।


এসব ঘটনায় বিবৃতি দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট ৩৮ নাগরিক। হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং তাঁদের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।


বিবৃতিতে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক ও পেশিশক্তির প্রভাব খাটিয়ে ভূমি দখল, বাড়িঘরে হামলা ও চরাঞ্চলের খাসজমি দখলের মতো ঘটনা ঘটছে। এতে জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।


অন্যদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর সশস্ত্র হামলা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। হামলায় জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।


সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবি জানায়, একই সঙ্গে দল ও অঙ্গসংগঠনের সহিংস কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা।


টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, হামলার শিকার গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হামলাকারী, তাঁদের সহযোগী ও পৃষ্ঠপোষকদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।


সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, দলীয় ব্যানারে পেশিশক্তির ব্যবহার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির কারণে এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটছে। সরকার কোনোভাবেই এ দায় এড়াতে পারে না।


তিনি বলেন, বিশেষ করে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি কেন্দ্র ও সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে এবং অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন। দেশের সংগঠিত বেশিরভাগ বড় অপরাধের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, রাজনৈতিক নেতা ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আঁতাতের মাধ্যমে এসব অপরাধ হয়ে থাকে।


তাঁর ভাষ্য, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়েছে। কেউ বিদেশে থাকার সুযোগে অন্যের সম্পত্তি দখল করতে হামলা, গোলাগুলি, ভাঙচুর ও লুটের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, দেশে আইনের শাসন নেই এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিষ্ক্রিয়, যা এখন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এসব সমস্যার সমাধান রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকেই আসতে হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন

0 Comments

No comments yet. Be the first to share your thoughts!

Leave a Comment

Moderated — may take a moment.