পদ্মা ট্রিবিউন | বাংলা নিউজ পেপার
বাংলাদেশ রাজনীতি বিশ্ব বাণিজ্য মতামত খেলা বিনোদন চাকরি জীবনযাপন ভিডিও

যাত্রীহীন নৌপথ, পেশা ছাড়ছেন ট্রলার মালিক ও চালকেরা

সমুদ্র উপকূলীয় তিনটি দ্বীপ নিয়ে গঠিত দাকোপ উপজেলার নদীপথে আগের মতো যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না।

প্রতিনিধি খুলনা
খুলনার দাকোপে চালনা নৌঘাট
খুলনার দাকোপে চালনা নৌঘাট | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় জেলা খুলনার দাকোপে নদীপথে ট্রলার চালানোর খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সাধারণ যাত্রী পারাপারের ট্রলারগুলোর জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় মাঝিরা ট্রলার ঘাটে বসিয়ে রেখে জীবিকার তাগিদে দিনমজুরি বা বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছেন।


ট্রলারচালক সুজিত মন্ডল, গফ্ফার হোসেন গাজী, আব্দুল্লাহ গাজী, এলাহী বক্স, খালেক ও বিধান সরদার জানান, সমুদ্র উপকূলীয় তিনটি দ্বীপ নিয়ে গঠিত দাকোপ উপজেলার নদীপথে আগের মতো যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না।


তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুন্দরবনসংলগ্ন কালাবগী থেকে চালনা লঞ্চঘাট পর্যন্ত নদীপথের দূরত্ব প্রায় ৪১ কিলোমিটার। এ পথে ছোট-বড় ২৯টি যাত্রীবাহী ট্রলার চলাচল করে। কালাবগী থেকে চালনা লঞ্চঘাট পর্যন্ত একবার যাতায়াতে একটি ট্রলারে ৮ থেকে ৯ লিটার ডিজেল লাগে। এ পথে জনপ্রতি ভাড়া ৮০ টাকা। যখন এই ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল, তখন প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ছিল ১১৫ টাকা। বর্তমানে প্রতি লিটারে ২০ টাকা বেড়ে দাম হয়েছে ১৩৫ টাকা।


ট্রলারচালকেরা জানান, বাধ্য হয়ে নদীপথের দূরত্ব অনুযায়ী জনপ্রতি ১০ থেকে ১২ টাকা অতিরিক্ত ভাড়া নিতে হচ্ছে। কালাবগী থেকে চালনা পর্যন্ত প্রতিটি ট্রলারে গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন যাত্রী পাওয়া যায়। এত কম যাত্রী নিয়ে ট্রলার চালালে কিছুদিন পর পথে বসতে হবে। এ পথে বর্তমানে মাত্র ৮ থেকে ৯টি ট্রলার চলছে। আগে আরও ট্রলার চললেও লোকসানের কারণে সেগুলোর মালিকেরা অন্যত্র চলে গেছেন অথবা চলাচল বন্ধ রেখেছেন। যাত্রী থাকুক বা না থাকুক, প্রতিদিন ট্রলার চালাতে একজন চালককে ৬৫০ টাকা এবং একজন কর্মচারীকে ৫০০ টাকা বেতন দিতে হয়।


নদীপথ এড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য বিকল্প কাঁচা সড়ক রয়েছে। তবে বর্ষাকালে এসব সড়কে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে বর্ষা মৌসুমে এ পথে যাত্রী বেশি হয়। এখন বর্ষা শেষ হওয়ায় নদীপথের যাত্রীরা দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে সড়কপথ বেছে নেবেন। ফলে ট্রলার চালিয়ে ডিজেলের খরচও তোলা সম্ভব হবে না। আয় করতে না পারলে ট্রলারের মালিক, চালক ও কর্মচারীদের পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।


এ পরিস্থিতিতে অনেকে ট্রলার চালানোর কাজ ছেড়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য বিকল্প পেশা বেছে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। সব মিলিয়ে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি ও নদীপথে যাত্রীসংকটের কারণে ট্রলারমালিক ও চালকেরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।


কালাবগী থেকে সড়কপথে চালনায় আসা ব্যবসায়ী আকবর সরদার বলেন, ট্রলারে যাতায়াত করলে খরচ বেশি হয়, পাশাপাশি সময়ও বেশি লাগে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এলাকার রাস্তাঘাট কাদামাটিতে ভরে থাকায় অতিরিক্ত খরচ হলেও ট্রলারে যাতায়াত করতেন। তখন জনপ্রতি ভাড়া ছিল ৮০ টাকা। বর্তমানে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে জনপ্রতি ভাড়া ১০ থেকে ১২ টাকা বেড়েছে। গ্রামের রাস্তাঘাট শুকিয়ে যাওয়ায় খরচ কমাতে এখন সড়কপথে ইঞ্জিনচালিত ভ্যানে যাতায়াত করছেন তিনি।


কালাবগী থেকে চালনা পর্যন্ত যাত্রীবাহী ট্রলারের চালক বকুল মল্লিক বলেন, একসময় এ নদীপথে ট্রলারে অনেক যাত্রী হতো। তখন ট্রলার চালিয়ে তাঁরা লাভবান হয়েছেন। শুকনো মৌসুমে যাত্রীরা নদীপথে চলাচল করতে চান না। সময় বাঁচাতে তাঁরা এখন সড়কপথ বেছে নিচ্ছেন। ফলে ট্রলারে যাত্রী কমে গেছে। বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ২০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় ভাড়াও কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। এতে আগের তুলনায় যাত্রী আরও কমেছে।


তিনি বলেন, ইতিমধ্যে এ নদীপথের অধিকাংশ ট্রলারের মালিক ও চালকেরা চলাচল বন্ধ করে অন্য পেশায় চলে গেছেন। বর্তমানে ট্রলার চালিয়ে যে আয় হচ্ছে, তাতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে ট্রলারটি ডাঙায় তুলে রেখে দিনমজুরের কাজ করবেন তিনি।


চালনা লঞ্চঘাটের নির্দিষ্ট ভাড়ায় ও ভাড়ার বিনিময়ে চালিত ট্রলারের মালিক জাফর হাওলাদার বলেন, তেলের দাম বাড়ার পর স্বাভাবিকভাবেই ট্রলারের ভাড়াও বাড়াতে হয়েছে। এখন আর আগের মতো আয় হচ্ছে না। ফলে সাধারণ যাত্রীরাও আগের মতো ট্রলার ভাড়া নিচ্ছেন না। এভাবে চলতে থাকলে পরিবার-পরিজন নিয়ে পথে বসতে হবে। তাই দীর্ঘদিনের এ পেশা ছেড়ে জীবিকার তাগিদে বিকল্প পেশায় যাওয়ার কথা ভাবছেন তিনি।


লক্ষ্মীখোলা খেয়াঘাটের ট্রলারচালক কামরুল ইসলাম বলেন, আগে নদী পারাপারে জনপ্রতি ভাড়া নেওয়া হতো ৫ টাকা। হঠাৎ ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন বাধ্য হয়ে জনপ্রতি ৬ থেকে ৭ টাকা নিতে হচ্ছে।


চালনা বাজারের খুচরা ডিজেল ব্যবসায়ী নিমাই সাহা জানান, দাম বৃদ্ধির আগে খুলনার যমুনা তেলভান্ডার থেকে ২০০ লিটারের এক ব্যারেল ডিজেল ২২ হাজার ৩০০ টাকায় কিনতেন। এখন একই তেলভান্ডার থেকে সেই ডিজেল কিনতে হচ্ছে ২৬ হাজার ৩০০ টাকায়। এরপর খুলনা থেকে চালনা বাজার পর্যন্ত প্রতি ব্যারেল ডিজেল পরিবহনে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা খরচ হয়। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে ক্রেতাদের কাছ থেকেও প্রতি লিটারে ২০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন

0 Comments

No comments yet. Be the first to share your thoughts!

Leave a Comment

Moderated — may take a moment.