পদ্মা ট্রিবিউন | বাংলা নিউজ পেপার
বাংলাদেশ রাজনীতি বিশ্ব বাণিজ্য মতামত খেলা বিনোদন চাকরি জীবনযাপন ভিডিও

মিরপুরে পানি–সংকট নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

রাজধানীর মিরপুরের কাজীপাড়া, শ্যাওড়াপাড়া, মনিপুর এলাকায় তীব্র পানি সংকট চলছে গত এক মাসের বেশি সময় ধরে।

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা
পানি–সংকটের কারণে আশপাশের এলাকা থেকে সংগ্রহ করা পানিতেই চলছে স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন কাজ
পানি–সংকটের কারণে আশপাশের এলাকা থেকে সংগ্রহ করা পানিতেই চলছে স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন কাজ | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ওয়াসা) চাহিদা অনুযায়ী পানি সরবরাহ করতে না পারায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন রাজধানীর মিরপুর এলাকার বাসিন্দারা। সংস্থাটির পুরোনো গভীর নলকূপগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা কমে আসার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় এই তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশঙ্কা করছেন, আগামী দিনগুলোতে মিরপুরের এই পানি সংকট আরও তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিতে পারে।


স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত এক মাসের বেশি সময় ধরে ওয়সার পাইপলাইনে পর্যাপ্ত পানি আসছে না। ফলে রান্নাবান্না, গোসল, কাপড় ধোয়া ও শৌচাগার ব্যবহারের মতো দৈনন্দিন জরুরি কাজগুলো মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার এখন চড়া দামে বাইরে থেকে খাবার পানি কিনে ব্যবহার করছেন। কেউ কেউ পানির অভাবে ঘরে রান্না করতে না পেরে হোটেলের খাবার কিনে খাচ্ছেন। আবার অনেক এলাকায় বাসিন্দাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে ওয়সার পানির গাড়ির পেছনে।


এলাকাবাসীর অভিযোগ, সাধারণত গভীর রাতে কিছুটা পানি পাওয়া গেলেও কয়েক দিন ধরে রাতের বেলাতেও সরবরাহ লাইনে পানির পর্যাপ্ত চাপ থাকছে না। ফলে রাতে জেগেও তাঁরা পানি সংগ্রহের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।


পানি সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন বহুতল ভবনের বাসিন্দারা। স্থানীয়দের মতে, একেকটি ভবনে গড়ে ৮০ থেকে ১৫০ জন মানুষ বসবাস করলেও পর্যাপ্ত পানি না থাকায় সবাইকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব পরিবারে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তি রয়েছেন, তাঁরা পড়েছেন সবচেয়ে বেশি বিপদে।


আবাসিক এলাকার অনেক মসজিদ ও মাদরাসাতেও পানি সংকটের কারণে চরম ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। পর্যাপ্ত পানি না থাকায় মুসল্লিরা মসজিদে এসে অজু করতে পারছেন না। আবার বাসাবাড়িতেও পানি না থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।


এই সংকটের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও। কাজীপাড়ার হোটেল ব্যবসায়ী শামসুল ইসলাম জানান, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে লাইনে পানি না থাকায় তিনি বাইরে থেকে চড়া দামে পানি কিনে ব্যবসা চালাচ্ছেন। এতে তাঁর ব্যবসায়িক পরিচালন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। একই অবস্থা স্থানীয় ক্ষৌরসভা বা সেলুনগুলোর। চুল ধোয়া বা অন্যান্য কাজের জন্য প্রয়োজনীয় পানি না থাকায় বাইরে থেকে পানি কিনে গ্রাহকদের সেবা দিতে হচ্ছে।


এমন পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর সঙ্গে স্থানীয় নলকূপ চালকদের বাগবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পাইপলাইন স্থাপনে কারিগরি ত্রুটির কারণে কিছু এলাকায় পানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। এ ছাড়া এলাকার কয়েকটি পাম্প বন্ধ থাকায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের (ওয়াসা) কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


তবে ওয়সাসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাভারের ভাকুর্তা এলাকায় স্থাপিত পানি শোধনাগার বা উৎপাদন কেন্দ্রের সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দেওয়ায় মিরপুর অঞ্চলেও পানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। সাভার ভাকুর্তা থেকে একসময় দিনে ১৫ কোটি লিটার পর্যন্ত পানি পাওয়া গেলেও সম্প্রতি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে তা ১২ থেকে ১৩ কোটি লিটারে নেমে এসেছে।


জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসা রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচালনা ও উন্নয়ন (মডস) অঞ্চল-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. এমদাদুল হক বলেন, ‘মিরপুর এলাকায় ঢাকা ওয়সার ১৮০টি গভীর নলকূপ রয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগই ২০ বছরের পুরোনো। এসব কূপে এখন আর পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যায় না। নতুন করে কূপ খননের জায়গা খোঁজা হচ্ছে। জায়গা পাওয়া গেলে মিরপুরের পানি সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব হবে।’


চলমান এই সংকট একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার অংশ এবং তা মিরপুর অঞ্চল দিয়ে শুরু হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ।


তিনি বলেন, ‘এখন থেকে ১৫-২০ বছর আগেও ঢাকা শহরে যে পরিমাণ মানুষ ছিল, তাদের পানি সরবরাহ করার সক্ষমতা ওয়সার তখন ছিল না। এখন প্রতিবছর আরও পাঁচ লাখ করে মানুষ বাড়ছে। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা সামাল দিতে গিয়ে সংস্থাটি অতিমাত্রায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তারা নতুন যেসব পানির উৎস তৈরি করছে, তার সবগুলোই ভূগর্ভস্থ। এখন মূল সমস্যাটা হলো, পানি উত্তোলন বেশি হলেও মাটির নিচে পানির পুনর্ভরণ বা রিচার্জ হচ্ছে না। যে কারণে শুধু মিরপুর নয়, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সারা ঢাকা শহরেই নেমে গেছে। প্রতিবছর গড়ে তিন ফুট করে পানি নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। ফলে পুরোনো নলকূপগুলো এখন আর কার্যকর থাকছে না। এই কারণেই ওয়াসা বলছে যে তাদের এখন আরও নতুন ও গভীর নলকূপ লাগবে।’


ভূগর্ভস্থ পানির ওপরে অতিরিক্ত নির্ভর করার সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে এই নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, ‘২০১৪-১৫ সালেও ওয়সার নেতৃত্বে যেসব গবেষণা করা হয়েছে, সেখানেও স্পষ্ট বলা হয়েছে যে ওয়সাকে স্থলভাগের বা ভূ-উপরিস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে হবে। মাটির নিচের পানির ওপর এভাবে নির্ভর করতে থাকলে এই শহর অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি পানি সংকটে পড়বে। তখন যে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল, তা কিন্তু এরই মধ্যে সত্যি হতে শুরু করেছে। আগামীতে ঢাকা মারাত্মক পানি সংকটে পড়বে, এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।’


মিরপুরের এই পানি সংকট আগামী দিনে ঢাকার অন্য এলাকাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক প্রকৌশলী সুজিত কুমার বালা। তিনি ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যানও।


সুজিত কুমার বালা বলেন, ‘ওয়াসা সাময়িক সক্ষমতা বাড়াতে অতিমাত্রায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়েছে। এতে কিছু সময় মানুষ হয়তো স্বস্তি পেয়েছিল। যদিও ওয়াসা এখন ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের দিকে কিছুটা নজর দিয়েছে, কিন্তু এই ব্যবস্থা চালু রাখা অনেক বেশি দক্ষতা এবং ব্যয়সাপেক্ষ ব্যাপার। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর এই নির্ভরশীলতা এভাবে অব্যাহত থাকলে আগামী এক-দুই বছরের মধ্যে রাজধানীতে পানি সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করবে।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন

How did this article make you feel?

Related Articles

0 Comments

No comments yet. Be the first to share your thoughts!

Leave a Comment

Moderated — may take a moment.