অভাব-সংগ্রাম পেরিয়ে কাজলের বিচারক হওয়ার গল্প
সেই গ্রামের কাজলই এখন সরকারি চাকরিতে বিচারকের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন।
অভাব আর ঋণের বোঝার মধ্যেই বড় হয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের কাজল পাঁড়ে। সেই কাজলই এখন বিচারকের আসনে বসার পথে। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় সহকারী জজ (সিভিল জজ) পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি।
কাজলের সাফল্যে পার্বতীপুর ইউনিয়নের মাধাইপুর গ্রামের চিত্রও বদলে গেছে। ২২ বছর আগে গড়ে ওঠা এই গ্রামে এতদিন কোনো সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন না। সেই গ্রামের কাজলই এখন সরকারি চাকরিতে বিচারকের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন।
জানা গেছে, কাজল মাধাইপুর গ্রামের ‘তুরি’ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভূমিহীন কৃষক নরেশ পাঁড়ে ও পঞ্চমী জেড়ি দম্পতির একমাত্র ছেলে। অভাবের কারণে তাঁর তিন বোনের পড়াশোনা প্রাথমিক স্তরেই থেমে যায়। অল্প বয়সেই তাঁদের বিয়ে হয়ে যায়। কাজলকেও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে পড়াশোনা করতে হয়েছে। অনেক সময় না খেয়েও তাঁকে ক্লাসে যেতে হয়েছে।
কাজল মাধাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মিশন স্কুল, এনায়েতপুর উচ্চবিদ্যালয় এবং রহনপুর ইউসুফ আলী কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন।
ছেলের পড়াশোনার খরচ চালাতে নরেশ পাঁড়েকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। এনজিও থেকে ঋণ নেওয়া, ঘরের গাভি বিক্রি—সবই করেছেন তিনি। অন্যের কাছে হাত না পেতে সরকারের ‘কাজের বিনিময়ে টাকা’ কর্মসূচিতে শ্রমিকের কাজ করে পাওয়া মজুরি দিয়ে ছেলের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন। পাশাপাশি কাজলও ক্যাম্পাসে টিউশনি করে নিজের কিছু খরচ চালিয়েছেন। অবশেষে ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় সুযোগ পাওয়ার মধ্য দিয়ে কাজলের পরিবারের দীর্ঘদিনের কষ্টের অবসান ঘটল।
ছেলে জজ হওয়ায় আবেগাপ্লুত মা পঞ্চমী জেড়ি। তিনি বলেন, ছেলে চরম কষ্ট করে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল, তা পূরণ হয়েছে। গ্রামের মানুষ আমাদের দেখতে আসছে, এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
কাজলের বোন স্বপ্না পাঁড়ে বলেন, দিন এনে দিন খাওয়া পরিবারের সন্তান আমরা। পড়ার সুযোগ না থাকায় আমাদের তিন বোনকে ছোটবেলায় বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। আমরা প্রাথমিক বিদ্যালয় পার করতে না পারলেও ভাই পড়াশোনার জন্য দিন-রাত কষ্ট করেছে।'
কাজলের সাফল্যে আবেগাপ্লুত বাবা নরেশ পাঁড়ে তাঁর আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় যখন ছেলে ফোন করে বলল, ‘বাবা, ভগবানের আশীর্বাদে আমি জজের চাকরি পেয়েছি’, তখন শুনে খুব খুশি হয়েছি।
তিনি আরও বলেন, আমরা গরিব মানুষ, দিন আনি দিন খাই। আমি চাই আমার ছেলে মাটি ও মানুষের কল্যাণে কাজ করবে। যে দায়িত্বে সে যাচ্ছে, তা যেন সততার সঙ্গে পালন করে।
১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় সুপারিশপ্রাপ্ত কাজল পাঁড়ে বলেন, মাধাইপুর গ্রামের প্রথম সরকারি চাকরিজীবী হতে পারাটা শুধু আমার একার আনন্দ নয়; এটি আমার পরিবার, গ্রাম ও পুরো নৃগোষ্ঠীর জন্য এক বড় বার্তা।
পড়াশোনার দিনের কথা স্মরণ করে কাজল বলেন, পড়াশোনার একপর্যায়ে আমাদের পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। তখন আমার বড় বোন ও বৃদ্ধা নানি নিজেদের গরু বিক্রি করে আমার হাতে টাকা তুলে দিয়েছিলেন। সেদিনের কথা আজও আমার পরিষ্কার মনে আছে।
তুরি জনগোষ্ঠীর মধ্যে কাজল পাঁড়েই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাতালিকায় ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী বলে জানান জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক বিভূতিভূষণ মাহাতো। তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের মধ্যেও কাজলই প্রথম জুডিশিয়ারিতে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। দারিদ্র্যের কারণে কাজলের পথ সহজ ছিল না। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে নিজের খরচ চালিয়েছেন, পরিবারকেও সহায়তা করেছেন। সেই সংগ্রাম পেরিয়ে বিচারক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে এখন আনন্দিত তাঁর পরিবারসহ মাধাই গ্রামের মানুষ।
পার্বতীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘গোবরে পদ্মফুল ফুটেছে। ছেলেটি ছোটবেলা থেকেই খুব ভালো পড়াশোনা করত এবং প্রচণ্ড মেধাবী ছিল। তাদের বলতে গেলে কোনো জমিজমা নেই। নিজের মেধা, চেষ্টা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সে আজ সহকারী জজ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর একজন তরুণ হিসেবে আমাদের উপজেলায় এত বড় একটি পদে তার সুপারিশ প্রাপ্তি সত্যিই গর্বের বিষয়। তার এই সাফল্য আমাদের এলাকার অন্য তরুণদেরও অনুপ্রেরণা জোগাবে।’