পদ্মা ট্রিবিউন | বাংলা নিউজ পেপার
বাংলাদেশ রাজনীতি বিশ্ব বাণিজ্য মতামত খেলা বিনোদন চাকরি জীবনযাপন ভিডিও

রাবিতে হামলায় স্পষ্ট ভিডিও ফুটেজ, তবু আসামি ‘অজ্ঞাতনামা’

এজাহারে চিহ্নিত ছাত্রসংগঠনের কোনো নামও ব্যবহার করা হয়নি

প্রতিনিধি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের নেতা–কর্মীদের হামলায় সাংবাদিকসহ ১০ জন আহত হয়েছেন। রোববার রাতে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের নেতা–কর্মীদের হামলায় সাংবাদিকসহ ১০ জন আহত হয়েছেন। রোববার রাতে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে | ছবি : ভিডিও থেকে নেওয়া

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলায় চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হওয়ার ঘটনায় মামলা হয়েছে। সোমবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. মনির হোসেন বাদী হয়ে মতিহার থানায় মামলা করেন। মামলায় কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।


এদিকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা করায় প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিক ও শিক্ষকেরা। তাঁরা বলছেন, হামলার একাধিক ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের চেনেন। গণমাধ্যমেও তাঁদের পরিচয় ও হামলায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এজাহারে চিহ্নিত ছাত্রসংগঠনের কোনো নামও ব্যবহার করা হয়নি।


রোববার রাতে ছাত্রদলের হামলায় চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। তাঁদের প্রথমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে, পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ ঘটনায় রাতেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে চিহ্নিত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করার দাবি জানান ক্যাম্পাসে কর্মরত সাংবাদিকেরা। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবীবের নেতৃত্বে হামলার অভিযোগ উঠেছে।


মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে মানহানিকর বিভিন্ন পোস্ট দেওয়া নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরে উত্তেজনা চলছিল। এরই ধারাবাহিকতায় সন্ধ্যা সোয়া সাতটার দিকে কয়েকজন শিক্ষার্থী, যাঁরা শহীদ জিয়াউর রহমান হলের আবাসিক বা অনাবাসিক শিক্ষার্থী নন, লাঠিসোঁটা নিয়ে অনধিকারভাবে হলের ভেতরে প্রবেশ করেন। পরে তাঁরা হলের ২১৪ নম্বর কক্ষ তল্লাশি করেন।


এজাহারে আরও বলা হয়, ওই শিক্ষার্থীরা হল থেকে বের হওয়ার সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে হলের গেটের সামনে কয়েকজন সাংবাদিক তাঁদের সামনে গিয়ে ভিডিও করতে শুরু করেন। ভিডিও করাকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের সঙ্গে ওই শিক্ষার্থীদের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে ওই শিক্ষার্থীরা হাতে থাকা লাঠিসোঁটা দিয়ে সাংবাদিকদের এলোপাতাড়ি মারধর করেন। এতে কয়েকজন সাংবাদিক আহত হন। পরে আহত সাংবাদিকদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁরা বর্তমানে চিকিৎসাধীন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।


ঘটনার সাক্ষী হিসেবে একজন সহকারী রেজিস্ট্রার ও দুজন নিরাপত্তা প্রহরীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েকজন ঘটনা সম্পর্কে জানেন ও শুনেছেন বলে এজাহারে বলা হয়েছে।


হামলাকারীদের পরিচয় প্রকাশ্যে আসার পরও তাঁদের নাম মামলার এজাহারে উল্লেখ না করায় প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিক ও শিক্ষকেরা। তাঁরা বলছেন, হামলার একাধিক ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের চেনেন। গণমাধ্যমেও তাঁদের পরিচয় ও হামলায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।


ক্যাম্পাসে কর্মরত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাবেক সভাপতি ইরফান তামিম বলেন, ‘ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাঁদের নামে মামলা এবং গ্রেপ্তার করার দাবি জানিয়েছিলাম।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এই দাবিতে অনড় ছিলাম। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের আশ্বস্ত করে, পরদিন দুপুর ১২টার মধ্যে মামলা করবে এবং দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু সন্ধ্যায় তারা যে মামলা করেছে, সেটি অজ্ঞাতনামা।’ তাঁর অভিযোগ, প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্নভাবে ঘোরাচ্ছে এবং প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত করছে। আসামিদের বাঁচানোর জন্য বা কোনো ছাত্রসংগঠনকে বাঁচানোর জন্য এমনটি করা হচ্ছে কি না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।


এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহ-উপাচার্য ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহা. ফরিদ উদ্দীন খান বলেন, ‘প্রশাসন মামলা করেছে, এটা আমরা স্বাগত জানাই। কারণ, এ ধরনের ঘটনায় মামলা করা মানে প্রশাসন বিষয়টি তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নিতে চাচ্ছে। তবে মামলায় যাঁদের পরিচয় ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শী ও সাক্ষ্যপ্রমাণ রয়েছে, তাঁদের অজ্ঞাতনামা রাখার কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।’


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলে মামলা করে। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় ভুক্তভোগীরা মামলা করলে সেটিই বেশি কার্যকর হতো বলে তিনি মনে করেন।


হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের ছাড় দেওয়া বা কোনো ছাত্রসংগঠনকে সুবিধা দেওয়ার কারণে মামলায় আসামি অজ্ঞাত রাখা হয়েছে—এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, প্রশাসন কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। তাঁর দায়িত্বকালে বিভিন্ন ঘটনায় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গত ছয় মাসে বিভিন্ন মেয়াদে ৯৯ জনকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অজ্ঞাতনামা আসামি করার প্রতিবাদে সাংবাদিক-শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। সোমবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের সামনে। ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

অজ্ঞাতনামা আসামি করার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ও কর্মরত সাংবাদিকেরা। সোমবার সন্ধ্যা সোয়া সাতটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে তাঁরা এ কর্মসূচি শুরু করেন।


এ সময় সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীরা ‘বাহ, ভিসি চমৎকার, সন্ত্রাসীদের পাহারাদার’, ‘ছাত্রদল হামলা করে, প্রশাসন কী করে’, ‘আমার ভাইয়ের ওপর হামলা কেন, প্রশাসন জবাব চাই’, ‘শিক্ষা–সন্ত্রাস, একসাথে চলে না’ প্রভৃতি স্লোগান দেন।


আন্দোলনকারীদের সঙ্গে রাত পৌনে আটটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান কথা বলতে আসেন। এ সময় তিনি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে উপাচার্যের সম্মেলনকক্ষে উপাচার্য মো. ফরিদুল ইসলাম বৈঠক করতে চান বলে জানান। তবে শিক্ষার্থীরা তাঁদের প্রাথমিক ও প্রথম দাবি বাস্তবায়িত না হওয়ায় আলোচনায় বসবেন না জানান।


আন্দোলনকারীরা জানান, হামলায় জড়িত নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে নাম উল্লেখ করে মামলা করতে হবে। এরপরই তাঁরা আলোচনায় বসবেন।


আন্দোলনকারীরা ছয়টি দাবি জানান। এগুলো হলো জড়িত ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করে মামলা করতে হবে এবং সোমবারের মধ্যে গ্রেপ্তার করতে হবে। হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সোমবারই সাময়িক বহিষ্কার করতে হবে। আগামী তিন দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে শুক্রবারের মধ্যে জরুরি সিন্ডিকেট ডেকে তাঁদের স্থায়ী বহিষ্কার করতে হবে। যাঁদের ছাত্রত্ব নেই, তাঁদের সনদ বাতিল করতে হবে এবং ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ ক্যামেরার ফুটেজ মুছে সন্ত্রাসীদের পক্ষ নেওয়ায় তাঁকে প্রাধ্যক্ষ পদ থেকে অব্যাহতি ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। ঘটনার সময় উপস্থিত থেকে নিষ্ক্রিয় থাকায় প্রক্টর ও সহকারী প্রক্টরদের পদত্যাগ করতে হবে।


আন্দোলনরত শিক্ষার্থী শাহ পরান বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে হামলাকারীদের স্পষ্ট বোঝা গেলেও প্রশাসন অজ্ঞাতনামা মামলা করেছে। হামলায় জড়িত নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে নাম উল্লেখ করে মামলা করতে হবে। এরপরই তাঁরা আলোচনায় বসবেন।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন

0 Comments

No comments yet. Be the first to share your thoughts!

Leave a Comment

Moderated — may take a moment.