১২ কারাগারে জায়গা নেই, বন্দি ধারণক্ষমতার আড়াই গুণ
এসব কারাগারে বন্দি ধারণক্ষমতা ৭ হাজার ৮৫০ জন হলেও বর্তমানে বন্দি রয়েছেন ১৯ হাজার ৯৬৬ জন।
চট্টগ্রাম বিভাগের ১২টি কারাগারে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দি থাকায় চরম চাপের মধ্যে রয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। এসব কারাগারে বন্দি ধারণক্ষমতা ৭ হাজার ৮৫০ জন হলেও বর্তমানে বন্দি রয়েছেন ১৯ হাজার ৯৬৬ জন।
অতিরিক্ত বন্দির চাপে কারাবিধি অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণির বন্দিকে পৃথক রাখার ব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন অপরাধ ও মামলায় আটক ব্যক্তিদের অনেক ক্ষেত্রেই একই সঙ্গে রাখতে হচ্ছে।
কারা কর্তৃপক্ষের সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের ১২টি কারাগারে পুরুষ বন্দির ধারণক্ষমতা ৭ হাজার ৪৭৯ জন এবং নারী বন্দির ধারণক্ষমতা ৪১৩ জন। এর বিপরীতে বর্তমানে পুরুষ বন্দি রয়েছেন ১৯ হাজার ২২২ জন এবং নারী বন্দি ৭৪৪ জন। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার তুলনায় পুরুষ বন্দি প্রায় আড়াই গুণ এবং নারী বন্দিও ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি।
এসব কারাগারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন ১ হাজার ১৩১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ৬৮ জন ও নারী ৬৩ জন। এ ছাড়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন ২৫৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২৪০ জন ও নারী ১৭ জন। অন্যদিকে, মাদক মামলায় আটক বন্দির সংখ্যা ৪ হাজার ২৬৮ জন।
কারা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কারাগারে বিভিন্ন শ্রেণি ও অপরাধের বন্দিদের পৃথক রাখার বিধান রয়েছে। কিন্তু ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত বন্দি থাকায় বাস্তবে সেই ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে একই স্থানে বিভিন্ন মামলার ও অপরাধে আটক বন্দিদের রাখতে হচ্ছে। অতিরিক্ত বন্দির চাপ সামাল দিতে গিয়ে কারা কর্তৃপক্ষকে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে।
২ হাজার ২৪৯ জনের ধারণক্ষমতার চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দির সংখ্যা ৬ হাজার ৯০৩ জন। এর মধ্যে মাদক মামলার আসামি ৯০৯ জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি আছেন ২২৬ জন, এর মধ্যে নারী ১৬ জন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি আছেন পুরুষ ৪৯৫ জন ও নারী ২২ জন। এ কারাগারে পুরুষ হাজতি ৫ হাজার ৪৯১ জন এবং নারী হাজতি ১৬৯ জন। পুরুষ কয়েদি ৪৯৫ জন ও নারী কয়েদি ২৩ জন। বিদেশি বন্দি আছেন ৭৬ জন।
১ হাজার ৭৪২ জনের ধারণক্ষমতার কুমিল্লা কারাগারে বর্তমানে বন্দি আছেন ৩ হাজার ১৮০ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ২ হাজার ১২৭ জন ও নারী ১০৬ জন। পুরুষ কয়েদি ৭১৩ জন এবং নারী ১৬ জন।
এ কারাগারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন তিনজন পুরুষ। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন পুরুষ ১৯৮ জন ও নারী ১৫ জন। মাদক মামলায় বন্দি আছেন ৮৩৩ জন।
৮৩০ জনের ধারণক্ষমতার কক্সবাজার কারাগারে বন্দি আছেন ২ হাজার ৮৮৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ২ হাজার ৭৪১ জন ও নারী ১৪৪ জন। পুরুষ কয়েদি ২৮৪ জন এবং নারী কয়েদি সাতজন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন চারজন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন পুরুষ ১৬২ জন ও নারী চারজন। বন্দিদের মধ্যে ৮৮৪ জন মাদক মামলার আসামি।
৭৮০ জনের ধারণক্ষমতার ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে বন্দি আছেন ২ হাজার ১৯১ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ১ হাজার ৫১৫ জন ও নারী ৩১ জন। পুরুষ কয়েদি ৫৩১ জন এবং নারী ৫৬ জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি আছেন দুইজন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন পুরুষ ৩৮ জন ও নারী পাঁচজন। মাদক মামলার আসামি আছেন ৬৮০ জন। বিদেশি বন্দি রয়েছেন একজন।
৫০০ জনের ধারণক্ষমতার নোয়াখালী কারাগারে বর্তমানে বন্দি আছেন ১ হাজার ৯০ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ৮৬৪ জন ও নারী ২৯ জন। পুরুষ কয়েদি ১২৯ জন এবং নারী পাঁচজন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি আছেন ছয়জন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন পুরুষ ৫৫ জন ও নারী দুইজন। মাদক মামলায় বন্দি আছেন ২০১ জন।
৪৭৫ জনের ধারণক্ষমতার চাঁদপুর কারাগারে বর্তমানে বন্দি ১ হাজার ৮৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ৮০১ জন ও নারী ২৮ জন। পুরুষ কয়েদি ২০৭ জন এবং নারী চারজন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি আছেন একজন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন পুরুষ ৪০ জন ও নারী চারজন। মাদক মামলায় বন্দি আছেন ৪৪৬ জন।
৫৬৪ জনের ধারণক্ষমতার ফেনী-১ কারাগারে বর্তমানে বন্দি আছেন ৫২৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ৩৯৫ জন ও নারী ১৮ জন। পুরুষ কয়েদি ৫৯ জন এবং নারী চারজন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি আছেন ১২ জন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন পুরুষ ২৮ জন ও নারী তিনজন। মাদক মামলায় বন্দি আছেন ১৩ জন। বিদেশি বন্দি রয়েছেন তিনজন।
৭২ জনের ধারণক্ষমতার ফেনী-২ কারাগারে বর্তমানে বন্দি আছেন ৪৬৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ১৭০ জন। পুরুষ কয়েদি আছেন ২৮১ জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি আছেন ১২ জন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন ১৩ জন পুরুষ।
২৯৫ জনের ধারণক্ষমতার লক্ষ্মীপুর কারাগারে বন্দি আছেন ৬৬৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ৪৪৯ জন ও নারী নয়জন। পুরুষ কয়েদি ১৫৩ জন এবং নারী চারজন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি আছেন দুইজন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন ৪৬ জন পুরুষ। মাদক মামলায় বন্দি আছেন ৬৩ জন।
১৪৮ জনের ধারণক্ষমতার রাঙামাটি কারাগারে বন্দি আছেন ২৬৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ২১১ জন ও নারী পাঁচজন। পুরুষ কয়েদি ৪৬ জন এবং নারী দুইজন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন পাঁচজন পুরুষ। মাদক মামলায় বন্দি আছেন ১০৮ জন। বিদেশি বন্দি রয়েছেন দুইজন।
১১৪ জনের ধারণক্ষমতার বান্দরবান কারাগারে বন্দি আছেন ৪৪১ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ৩৪৬ জন ও নারী আটজন। পুরুষ কয়েদি ৬২ জন এবং নারী তিনজন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন পুরুষ ১৮ জন ও নারী একজন। মাদক মামলায় বন্দি আছেন ৮৪ জন। বিদেশি বন্দি রয়েছেন ৪৫ জন।
৮১ জনের ধারণক্ষমতার খাগড়াছড়ি কারাগারে বন্দি আছেন ২৬৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ হাজতি ২১৮ জন ও নারী দুইজন। পুরুষ কয়েদি ৪৪ জন এবং নারী একজন। মাদক মামলায় বন্দি আছেন ২১ জন।
কারাগার সূত্র জানিয়েছে, জেল কোড অনুযায়ী প্রত্যেক বন্দিকে ৩৬ বর্গফুটের জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার কথা। অথচ চট্টগ্রামের ১১টি কারাগারে বন্দির সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ায় এই সুবিধা দেওয়া যাচ্ছে না। একজনের জায়গায় দুই থেকে তিনজন করে রাখতে হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, ‘কারাগারের মূল স্লোগান হচ্ছে—রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ। তাই কারাগার শুধু শাস্তি দেওয়ার স্থান নয়, এটি একটি সংশোধনাগারও। বন্দিদের মানবিক জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কারাবিধি অনুযায়ী একজন বন্দি যেসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকারী, তা তাকে দিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘কারাগারে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তি অপরাধী—এমনটি মনে করার সুযোগ নেই। অনেকেই মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলায় কারাগারে রয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে এমন মামলায় আটক ব্যক্তিদের আদালত থেকে খালাস পাওয়ার ঘটনাও আমরা দেখেছি। তাই বিচারাধীন বন্দিদেরও মানবিক মর্যাদা ও কারাবিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।’
তিনি আরও বলেন, ‘আধুনিক সমাজে কারাগারগুলো সংশোধনাগার হওয়ার পরিবর্তে দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। শুনছি, অনেক মামলার আসামির জামিননামা কারাগারে পৌঁছানোর পরও তাঁদের মুক্তি দেওয়া হচ্ছে না। নতুন মামলা দেওয়ার কথা বলে কিংবা থানা-পুলিশকে খবর দিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে নতুন মামলা দেওয়ার আয়োজন করা হচ্ছে। বিষয়টি অমানবিক, অগ্রহণযোগ্য।’
অতিরিক্ত বন্দির কারণে কারাগারের কর্মকর্তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন) মো. ছগির মিয়া। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগের ১২টি কারাগারে বন্দির সংখ্যা ২০ হাজার। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দি রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ কয়েকটি কারাগারে বন্দির সংখ্যা কিছুটা বেশি। চট্টগ্রামে নতুন একটি কারাগারের জন্য প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। বন্দিদের যত্নে কোনও প্রকার সমস্যা হচ্ছে না। তবে বেশি বন্দির কারণে কিছুটা সমস্যা তো হচ্ছেই।’