পদ্মা ট্রিবিউন | বাংলা নিউজ পেপার
বাংলাদেশ রাজনীতি বিশ্ব বাণিজ্য মতামত খেলা বিনোদন চাকরি জীবনযাপন ভিডিও

বিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচির মুখে বিএনপির পাল্টা তৎপরতা

সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের তৎপরতাও বিএনপির নীতিনির্ধারকদের ভাবনায় ফেলেছে

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা
বিএনপির লোগো
বিএনপির লোগো

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলোর ধারাবাহিক কর্মসূচি ও কার্যক্রম এবং নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৎপরতার মধ্যে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে বিএনপি। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, মাঠে পাল্টা কর্মসূচির প্রস্তুতি নিতে সাংগঠনিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে ইতিমধ্যে ‘অঘোষিত’ কর্মসূচিও শুরু করেছে দলটি। তবে বিএনপির নেতারা বলছেন, কোনো চাপের কারণে নয়, বিরোধীদের ‘অপপ্রচার’ ও আওয়ামী লীগের তৎপরতার জবাব দিতেই তাঁরা কর্মসূচি করছেন।


বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অর্থনৈতিক সংকটসহ নানা চাপের মধ্যে হঠাৎ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে দলের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। আগে থেকেই জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) কয়েকটি বিরোধী দল নানা কর্মসূচিতে রয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি তাদের কর্মসূচিতে নতুন ইস্যু যুক্ত করেছে।


সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের তৎপরতাও বিএনপির নীতিনির্ধারকদের ভাবনায় ফেলেছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাস ও বাস-ট্রেনে অগ্নিসংযোগের পেছনে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করছেন বিএনপির নেতারা। এসব নিয়ে দলের ভেতরে উদ্বেগ রয়েছে বলে জানা গেছে।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা ও মন্ত্রী বলেন, দিন যত যাচ্ছে, সরকারের ভাবমূর্তি কমছে। এ পরিস্থিতিতে এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিই সরকারের একমাত্র পুঁজি।


দলীয় সূত্রগুলো বলছে, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গত কয়েক দিনে বিএনপির যে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হচ্ছে, সেগুলো মূলত বিরোধী দলের কর্মসূচির পাল্টা এবং আওয়ামী লীগের তৎপরতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান জানানোর অংশ। পাশাপাশি জেলা ও মহানগর পর্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


গত শুক্রবার চট্টগ্রাম বিভাগের নেতাদের সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক করেছে বিএনপি। এতে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও বিশেষ সম্পাদক বেলায়েত মৃধা উপস্থিত ছিলেন। কয়েক দিনের মধ্যে ঢাকা বিভাগের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এতে প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান অংশ নিতে পারেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।


বিএনপির সাংগঠনিক তৎপরতার ধরন থেকে বোঝা যাচ্ছে, দলটি সরকারের প্রশাসনিক কাজকর্মের পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে মাঠে সক্রিয় থাকাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে।


জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা-রংপুর দীর্ঘ পদযাত্রা করেছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ-সংকটের সমাধান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং দুর্নীতি-চাঁদাবাজি বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে এসব কর্মসূচি হয়। ঐক্যের সমন্বয়ক এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ কর্মসূচিতে বলেছেন, এসব তৎপরতার কারণে সরকার চাপ অনুভব করছে।


এর মধ্যেই ২১ সেপ্টেম্বর জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। লিটারপ্রতি দাম বাড়ানো হয় ২০ টাকা করে। এর প্রতিবাদে জামায়াত, এনসিপি, খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি দল কর্মসূচি পালন করে। তাদের বক্তব্য, মানুষ এমনিতেই দ্রব্যমূল্যের চাপে আছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও নিত্যপণ্যের ব্যয় আরও বাড়বে।


সরকার বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে দাম বেশি হওয়ায় কম দামের জ্বালানি পাচারের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম বলেছেন, দাম না বাড়ালে শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং সব ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্যে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বা লোকসানের চাপ তৈরি হতো।


অবশ্য নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম যে হারে বেড়েছে, তাতে দেশে দাম না বাড়ানোর খুব বেশি বিকল্প সরকারের ছিল না। তবে দাম বেশি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে ডিজেলের দাম কম বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষ ও শিল্পকারখানার ওপর চাপ কম পড়ত। বৈশ্বিক বাজারে দাম কমলে দ্রুত সমন্বয়ের ওপর জোর দেন তিনি।


বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী একাধিক সভা-সমাবেশে বলেছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির জন্য সরকার দায়ী নয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, দাম বাড়ানোর পরও সরকার প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ৭০ টাকা লোকসান বহন করবে।


দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি সম্পর্কে রুহুল কবির রিজভী বলেন, কোনো চাপের কারণে বিএনপি কর্মসূচি করছে না। বিরোধী দল একের পর এক কর্মসূচি করছে এবং অপপ্রচার চালিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। এই বিভ্রান্তি দূর করতে হবে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা তৈরির লক্ষ্যে সন্ত্রাস ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, বিরোধী দলের বিভ্রান্তি দূর করা এবং ফ্যাসিবাদী শক্তির মোকাবিলার জন্য বিএনপি রাজনৈতিক কর্মসূচি করছে।


অবশ্য জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জ্বালানির সমস্যা সরকার ও বিরোধী দল—সবার জন্য। কারও ওপর চাপ তৈরির জন্য নয়, দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে সমস্যার সমাধানে বিরোধী দল কর্মসূচি দিচ্ছে। সরকারকে জবাবদিহি ও সতর্ক করার বার্তা দেওয়াও একধরনের সহযোগিতা।


সব মিলিয়ে বিরোধী দলগুলোর ধারাবাহিক কর্মসূচি এবং আওয়ামী লীগের তৎপরতার মধ্যে বিএনপিও মাঠে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। দলটির নেতারা অবশ্য এটিকে বিরোধীদের চাপের পাল্টা প্রতিক্রিয়া বলতে চান না। তাঁদের বক্তব্য, বিরোধীদের ‘অপপ্রচার’ মোকাবিলা, আওয়ামী লীগের তৎপরতার জবাব এবং নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান মানুষের সামনে তুলে ধরতেই মাঠের কর্মসূচি ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি বাড়ানো হচ্ছে।

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

0 Comments

No comments yet. Be the first to share your thoughts!

Leave a Comment

Moderated — may take a moment.