পদ্মা ট্রিবিউন | বাংলা নিউজ পেপার
বাংলাদেশ রাজনীতি বিশ্ব বাণিজ্য মতামত খেলা বিনোদন চাকরি জীবনযাপন ভিডিও

জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের অপেক্ষায় রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প

আগামী ডিসেম্বরের শেষে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের অতিরিক্ত চালান সড়কপথে প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। গতকাল পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়া রেলগেট এলাকায়
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের অতিরিক্ত চালান সড়কপথে প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। গতকাল পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়া রেলগেট এলাকায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর চূড়ান্ত ধাপের দিকে যাচ্ছে পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রথম ইউনিটের নিরাপত্তা ভাল্‌ভের পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হয়েছে গত বুধবার। আরও উচ্চ চাপে একটি পরীক্ষা করা হবে। আগামী ডিসেম্বরের শেষে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।


রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্র বলছে, চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিভাজন বিক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপাদন প্রক্রিয়া সেপ্টেম্বরে শুরুর পরিকল্পনা ছিল। নিরাপত্তা ভাল্‌ভের পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় তা পিছিয়ে যায়। গত বুধবার পরীক্ষার সময় নিয়ন্ত্রণ ভাল্‌ভগুলো ঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা যাচাই করা হয়েছে। পরীক্ষা শুরুর আগে অগ্নিনিরাপত্তা ও তেজস্ক্রিয়তা-সংক্রান্ত নিরাপত্তাব্যবস্থাও যাচাই করা হয়।


পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট চালু করতে এ ধরনের পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। চুল্লির ভেতরের মূল ব্যবস্থায় চাপ নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ভাল্‌ভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে তা কমিয়ে নিরাপদ অবস্থায় রাখতে এটি কাজ করে। প্রয়োজনীয় সব শর্ত পূরণ করেই পরীক্ষা চালানো হচ্ছে।


বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্র বলছে, কেন্দ্রটির প্রধান নিয়ন্ত্রণকক্ষ ও জরুরি নিয়ন্ত্রণকক্ষ—দুই জায়গা থেকেই পরীক্ষাটি পরিচালনা করা হয়। এতে প্রথম ইউনিটের চাপ নিয়ন্ত্রণ ও অতিরিক্ত চাপ কমানোর পরীক্ষা শেষ হয়েছে। ভাল্‌ভ খোলা ও বন্ধ হওয়ার সময়, সাড়া দেওয়ার গতি, সতর্কসংকেত এবং বিভিন্ন কার্যক্রমের প্রয়োজনীয় চাপ ও তাপমাত্রার তথ্য পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। গত বুধবার সকালে নিরাপত্তা ভাল্‌ভের ১৬ মেগাপ্যাসকেল চাপের পরীক্ষাটি করা হয়, যা শুরু হয় মঙ্গলবার রাতে। খুব শিগগির ১৮ মেগাপ্যাসকেল চাপে আরেকটি পরীক্ষা হওয়ার কথা রয়েছে।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, মেগাপ্যাসকেল হলো চাপের মাত্রা। পারমাণবিক চুল্লিপাত্রে স্বাভাবিক চাপ হলো ১৬ মেগাপ্যাসকেল। এটি সফল হওয়ার মানে হলো বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালানো যাবে। তবে অবশ্যই আরও উচ্চ চাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা থাকতে হবে। তাই ১৮ মেগাপ্যাসকেলে পরীক্ষাটি গুরুত্বপূর্ণ। ডিসেম্বরে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা অবাস্তব নয়, চাইলে তা অর্জন করা সম্ভব।


বিদ্যুৎকেন্দ্রের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেন, চূড়ান্ত ধাপের আরও কয়েকটি পরীক্ষা বাকি আছে, যা অতটা কঠিন নয়। এসব পরীক্ষা শেষে শুরু হবে তাপশক্তি উৎপাদন। এ তাপ দিয়েই বাষ্প তৈরি করে ঘোরানো হবে টারবাইন, উৎপাদন হবে বিদ্যুৎ। এর মধ্যেই সম্প্রতি পারমাণবিক জ্বালানির চালান আসা নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।


বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, রূপপুরের পারমাণবিক জ্বালানি নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা নেই। প্রথম ইউনিটের সব জ্বালানি ২০২৩ সালেই রূপপুর পৌঁছায়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিপাত্রে জ্বালানি প্রবেশ করানো শেষ হয় গত মে মাসে। গত শুক্রবার রাতে প্রথম ইউনিটের জন্য একটি অতিরিক্ত চালান এসেছে। গত শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় সেনাবাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তায় এটি রূপপুরে পৌঁছায়। আর দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানি তৈরি আছে। আগামী বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় ইউনিটের প্রথম চালান দেশে পৌঁছাতে পারে। সব মিলিয়ে এ দফায় মোট ৯টি চালান আসার কথা রয়েছে।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাইলেই পারমাণবিক জ্বালানি পাওয়া সম্ভব নয়। তাই আগে থেকে মজুত করে রাখতে হয়। প্রথম ইউনিট থেকে শক্তি উৎপাদন শুরুর পর কোনো একটি জ্বালানি সংযোজন যদি কাজ না করে, সঙ্গে সঙ্গে সেটি বদলাতে হবে। তাই অতিরিক্ত জ্বালানি আনা হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী ডিসেম্বরের আগে দ্বিতীয় ইউনিটের সব জ্বালানি এনে রূপপুরে রাখতে হবে।


দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরমাণু শক্তি কমিশন। কমিশনের অধীনে পরিচালনার কাজটি করছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)। রূপপুরে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট।


বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, একটি ত্রুটির কারণে দুই মাস পিছিয়ে যেতে হয়েছে। এখন সব ঠিকঠাক এগোচ্ছে। জ্বালানি নিয়েও কোনো অনিশ্চয়তা নেই। প্রতি সপ্তাহে একটি করে জ্বালানির চালান আসার কথা রয়েছে। অল্প কিছু পরীক্ষা শেষ হলেই পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।


রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্র বলছে, চুল্লিপাত্রে শক্তি উৎপাদন শুরু হতে পারে এ মাসের শেষ দিকে। শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা ৩ থেকে ধাপে ধাপে বেড়ে ৩০ শতাংশে উন্নীত হলেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সংযোগ করা সম্ভব হবে। এরপর ৩০০ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।


বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তারা বলছেন, শুরুর পর টানা ৭-৮ মাস চলতে পারে পরীক্ষামূলক উৎপাদন। তবে গ্রিডে বিদ্যুৎ গেলেই পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় বিশ্বের ৩৩তম দেশ হবে বাংলাদেশ। এর আগে ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি আসার পরই পারমাণবিক স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি পায় রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র। জ্বালানি বুঝে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পারমাণবিক শক্তির অধিকারী দেশের তালিকায় নাম ওঠে বাংলাদেশের।


২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল রূপপুর প্রকল্পের মেয়াদ। দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে প্রকল্পের মেয়াদ। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে মেয়াদ বাড়লেও প্রকল্পের খরচ বাড়ানোর সুযোগ নেই। কিন্তু ডলারের দাম বাড়ায় ২৬ হাজার কোটি টাকা খরচ বেড়েছে প্রকল্পের। ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা খরচ হবে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন

0 Comments

No comments yet. Be the first to share your thoughts!

Leave a Comment

Moderated — may take a moment.