রিয়াদ ইসলাম
অলংকরণ: আরাফাত করিম |
রমজান মানেই ছোটবেলার এক আনন্দময় সময়, যেখানে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকত খুনসুটি, উত্তেজনা আর নির্মল আনন্দের মুহূর্ত। এখন সেই দিনগুলো শুধুই স্মৃতির পাতায় বন্দী, কিন্তু একবার ভাবলেই যেন সেই সময়ের আবেগ, গন্ধ, অনুভূতি সব ফিরে আসে।
আমার বয়স তখন ১২-১৪ বছর। সেই বছরই প্রথম রোজা রাখার সিদ্ধান্ত নেই। ছোটবেলায় বেশ চিকন থাকায় মা কখনোই চাইতেন না আমি রোজা রাখি। তার ভয় ছিল, আমি হয়তো অসুস্থ হয়ে পড়ব, দুর্বল হয়ে যাব। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মায়েরই এমনটাই ভাবনা— বাচ্চারা রোজা রাখলে অসুস্থ হয়ে পড়বে। কিন্তু আমার ছিল অন্যরকম এক জেদ। তাই প্রথম কয়েকদিন নিজেই উঠে পড়তাম সাহরির সময়, যেন কাউকে আমাকে ডাকতে না হয়। কিন্তু কয়েকদিন পর ক্লান্ত হয়ে সাহরির জন্য উঠতে পারতাম না, আর মা-ও ডাকতেন না।
একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, সবাই সাহরি খেয়ে নিয়েছে, শুধু আমিই বাদ। আমার যে কী কষ্ট লেগেছিল! রাগে-জিদে লাল হয়ে গেলাম। মা তখন আমাকে বুঝিয়ে বললেন, 'তুই তো ঠিক মতো উঠতে পারিস না, তাই আর ডাকিনি।' কিন্তু আমার চোখে তখন অভিমানের ছাপ। এরপর থেকে মা প্রতিদিন আমাকে ডেকে দিতেন, আর আমি হাসিমুখে সাহরির জন্য উঠে যেতাম।
রমজানের আরেকটা বড় আনন্দ ছিল তারাবির নামাজ। তখনকার দিনে নামাজে যাওয়া মানেই শুধু নামাজ পড়া নয়, বরং বন্ধুরা মিলে নানারকম মজার ঘটনা ঘটানোও ছিল এর অংশ। ইমামের দীর্ঘ কেরাত কখন শেষ হবে, সেটা ভাবার সময়ই থাকত না। তার বদলে আমরা সুযোগ বুঝে বাইরে বেরিয়ে পড়তাম।
সেই সময়ের সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল— নামাজের অজুহাতে ঘরের বাইরে থাকা, কিন্তু বাস্তবে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো, গল্প করা, খেলাধুলা করা। আবার অনেক সময় আম-কাঠালের মৌসুম হলে গাছের নিচে গিয়ে আম পড়ার অপেক্ষা করতাম, কখন গাছ থেকে কোনো ফল পড়বে আর আমরা সেটা লুফে নেব! মাঝে মাঝে আবার দুষ্টুমি করে গোপনে এস এস স্কুলের গোপী দাদার গাছের আমও পাড়তাম। তখন এসব দুষ্টুমি মনে হতো এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ।
রমজানের গরমের দিনে দুপুরবেলা দীর্ঘ সময় উপজেলা পরিষদের পুকুরে বা টিউবওয়েলের পানিতে ডুব দিয়ে থাকতাম। মনে হতো, পানি শরীরকে শীতল করে দিচ্ছে, আর রোজার কষ্ট অনেকটাই কমে গেছে। বন্ধুরা মজা করে বলত, 'তোর রোজা হালকা হয়ে গেছে, কারণ তুই অনেকক্ষণ ধরে পানিতে ডুব দিয়ে আছিস!' যদিও আমরা জানতাম এটা সত্যি না, কিন্তু সেই বন্ধুত্বপূর্ণ খুনসুটি, হাসাহাসি, পরস্পরের দুষ্টুমি আজও মনে পড়ে।
রমজান শুরু হওয়ার পর থেকেই একটা কাউন্টডাউন চলত— কবে ঈদ আসবে! প্রতিদিন চাঁদের খবর নিতাম, কবে নতুন চাঁদ উঠবে, কবে ঈদের দিন ঠিক হবে। ঈদের আগের রাত, যাকে বলে চাঁদ রাত, সেটাও ছিল অসাধারণ। নতুন জামা-কাপড়, মেহেদির গন্ধ, আতর-মাখা পোশাক— সব মিলিয়ে এক অন্যরকম অনুভূতি তৈরি হতো।
আজ সেই শৈশব নেই, নেই সেই বন্ধুরাও। কেউ পড়াশোনার জন্য বাইরে, কেউ চাকরির পেছনে ছুটছে, কেউবা জীবনসংগ্রামে ব্যস্ত। এখন রমজান এলেও আর সেই উচ্ছ্বাস নেই, দুষ্টুমিগুলোও পরিণত হয়েছে শৃঙ্খলায়।
কিন্তু স্মৃতিগুলো রয়ে গেছে হৃদয়ের গভীরে। মাঝে মাঝে রমজানের রাতের চাঁদ দেখলে মনে হয়, যদি আবার ফিরে যেতে পারতাম সেই সোনালি শৈশবে! কিন্তু সময় তো আর ফিরে আসে না, শুধু রেখে যায় মধুর স্মৃতির রেশ।
রমজানের এই মিষ্টি স্মৃতিগুলো আজীবন মনে থাকবে, ঠিক যেমন থাকে ঈদের চাঁদের আলো, ইফতারের সুরভি আর শৈশবের নির্মল আনন্দের মুহূর্ত।
● লেখক: সাংবাদিক