কূটনৈতিক প্রতিবেদক

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর | ছবি: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়/ফেসবুক থেকে নেওয়া

ওমানের রাজধানী মাস্কটে আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠেয় ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

দুই দেশের সম্পর্কে যাতে অস্বস্তি না বাড়ে, এমন বার্তা এই পরিকল্পিত বৈঠকে দিতে পারে বাংলাদেশ। পরিকল্পিত বৈঠকটি নিয়ে কূটনৈতিক সূত্রগুলো গতকাল রোববার এমন আভাস দিয়েছে।

মাস্কটে ১৬ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ৮ম ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্স (আইওসি ২০২৫)। এটি ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলন নামে পরিচিত। ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ভারতের নয়াদিল্লিভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন এই সম্মেলনের আয়োজন করছে। সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য গত মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে আমন্ত্রণ জানান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

মাস্কটে তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে এস জয়শঙ্করের পরিকল্পিত বৈঠকটি হলে এটি হবে পাঁচ মাসের মধ্যে দুজনের দ্বিতীয় দফা আলোচনা।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে তৌহিদ হোসেন ও এস জয়শঙ্কর প্রথমবার আলোচনায় বসেছিলেন। বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নিউইয়র্কে তৌহিদ হোসেন ও এস জয়শঙ্করের মধ্যকার আলোচনায় দুই দেশ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছিল।

নিউইয়র্কের আলোচনার ধারাবাহিকতায় গত ডিসেম্বরে ঢাকায় এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি। সংক্ষিপ্ত সফরে ঢাকায় এসে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব মো. জসীম উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করেন।

প্রায় ১২ ঘণ্টার সফরে বিক্রম মিশ্রি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন ও সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। মূলত আগস্ট-পরবর্তী টানাপোড়েন আর অস্বস্তি দূর করে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে এগিয়ে নিতেই দুই দেশ সে সময় আলোচনায় বসেছিল।

বিক্রম মিশ্রির ঢাকা সফরের ঠিক আগে ভারতের আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলা হয়। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ভারতের হিন্দুত্ববাদী হিন্দু সংঘর্ষ সমিতিসহ কয়েকটি সংগঠনের সমর্থকেরা এই হামলা চালান।

৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ভারতের রাজনৈতিক মহলসহ নানা পক্ষ দেশে-বিদেশে প্রচার-প্রচারণা ও বিক্ষোভ চালিয়ে গেছে। এ বিষয়ে ভারতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি মূলধারার গণমাধ্যমে অব্যাহতভাবে ভুল ও অপতথ্যের বিস্তার ঘটেছে।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ ঘিরে ভারত থেকে অপপ্রচারের প্রবাহ কমার পর্বে সম্পর্কে নতুন করে তিক্ততা বাড়ান দেশটিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা।

নয়াদিল্লিতে বসে শেখ হাসিনার নানা বক্তব্য-বিবৃতি ভালোভাবে নেয়নি বাংলাদেশ। তাই তাঁর রাশ টানতে ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ। কিন্তু এই অনুরোধে ভারত সাড়া দেয়নি। এ অবস্থায় ভারতে বসে শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্য-বিবৃতি অব্যাহত রেখেছেন।

নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের ফেসবুক পেজে ৫ ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনার ভাষণ প্রচারের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ছাত্র-জনতার মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। এদিন রাতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি ভাঙচুর করা হয়। আগুন দেওয়া হয়। পরে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

এ ঘটনা নিয়ে ৬ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকার একটি বিবৃতি দেয়। বিবৃতিতে বলা হয়, পলাতক অবস্থায় ভারতে বসে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার উসকানিমূলক বক্তব্যের কারণে জনমনে গভীর ক্রোধের সৃষ্টি হয়েছে, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। সরকার আশা করে, ভারত যেন তার ভূখণ্ডকে বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে, এমন কাজে ব্যবহৃত হতে না দেয়। শেখ হাসিনাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না দেয়। অন্তর্বর্তী সরকার ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি চায় না।

শেখ হাসিনার ৫ ফেব্রুয়ারির ভার্চ্যুয়াল বক্তব্যের জেরে ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ৭ ফেব্রুয়ারি নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব করে পাল্টা জবাব দেয় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সবশেষ গতকাল বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মোহাম্মদ রফিকুল আলম বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের বক্তব্যকে ‘অপ্রত্যাশিত’ ও ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বলে মন্তব্য করেছেন।

দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এখন যে টানাপোড়েন চলছে, তা বিরল। গত ১৫ বছর দুই দেশের সম্পর্ক ছিল সরকারকেন্দ্রিক ঘনিষ্ঠতার মোড়কে বাঁধা। এই পর্ব বাদ দিলে গত সাড়ে তিন দশক ওঠানামার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক। তবে গত ছয় মাসে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের যে দূরত্ব প্রকাশ্যে এসেছে, তা অতীতে কখনো কেউ দেখেননি।

এমন প্রেক্ষাপটে ওমানের মাস্কটে অনুষ্ঠেয় ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের মধ্যকার পরিকল্পিত আলোচনা কেমন হতে পারে?

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে অনুষ্ঠিত প্রতিটি বৈঠকেই সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হয় দুই দেশ। কিন্তু সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কথা বলার পরও ভারতের দিক থেকে যেসব আচরণ করা হয়েছে, তাতে বাংলাদেশ অসন্তুষ্ট।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো আরও বলছে, সম্প্রতি ভারত বিনা উসকানিতে অযাচিতভাবে সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি করেছে। আগরতলা ও কলকাতায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। শেখ হাসিনাকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশ নিয়ে ক্রমাগত মিথ্যাচার চলছে। এ ঘটনায় ঢাকা অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের হস্তক্ষেপকে ভালোভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, মাস্কটে তৌহিদ হোসেন ও এস জয়শঙ্করের মধ্যে যে বৈঠকটি হওয়ার কথা, সেখানে এগুলো বন্ধ করার আহ্বান জানাবে ঢাকা। ভারতে থাকা পলাতক কোনো অপরাধী যাতে সেখানে বসে বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি না করেন, সেই আহ্বানও জানানো হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, ভারতের সঙ্গে বরাবরই সম্পর্কের উন্নয়ন চেয়েছে বাংলাদেশ। ফলে সম্পর্ক যাতে অবনতির দিকে না যায়, সেই বার্তা মাস্কটের পরিকল্পিত বৈঠকে ঢাকার পক্ষ থেকে নয়াদিল্লিকে দেওয়া হবে।

শেখ হাসিনাকে থামাতে ভারতকে ইতিমধ্যে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ। মাস্কটের পরিকল্পিত বৈঠকেও একই বার্তা দেওয়া হবে বলে জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। তাঁরা বলেন, ভারতে বসে শেখ হাসিনার বাংলাদেশবিরোধী কার্যক্রম দুই দেশের সম্পর্কের অন্তরায় হবে বলে পরিষ্কার বার্তা দেবে ঢাকা।

মাস্কটের পরিকল্পিত বৈঠকে ঢাকার পক্ষ থেকে সীমান্ত হত্যা বন্ধ, দুই দেশের সীমান্ত নিয়ে সম্মত সিদ্ধান্ত মেনে চলা, সীমান্তের শূন্যরেখায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করে উত্তেজনা না বাড়ানোর অনুরোধও ঢাকার পক্ষ থেকে জানানো হবে বলে জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।