প্রতিনিধি কুমিল্লা

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষকে প্রায় দেড় ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী। মঙ্গলবার সকালে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

‘নিরাপত্তার স্বার্থে’ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের মসজিদে তাবলিগের তালিম বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে কার্যালয়ে প্রবেশ করে কলেজের অধ্যক্ষকে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনা ঘটেছে।

মঙ্গলবার দুপুরে কুমিল্লা শহরতলির ধর্মপুরে অবস্থিত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে অধ্যক্ষের দপ্তরে এ ঘটনা ঘটে। এরই মধ্যে অধ্যক্ষ মো. আবুল বাশার ভূঞাকে শাসিয়েছে কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থীসহ এলাকাবাসী। অবরুদ্ধ করে শাসানোর ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামীকাল বুধবার কলেজের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে।

কলেজ সূত্র জানায়, ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসের মসজিদে প্রায় সময়ই তাবলিগ জামাতের তালিম কার্যক্রম চলে। সম্প্রতি মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসারীদের সঙ্গে মাওলানা জুবায়ের অনুসারীদের ঝামেলাও হয়েছে। এ ঘটনায় কলেজের নিরাপত্তার স্বার্থে মসজিদে তাবলিগের তালিম বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন কলেজ অধ্যক্ষ। এ ঘটনায় একটি পক্ষ ক্ষিপ্ত হয়ে মঙ্গলবার বেলা ১১টা ২০ মিনিট থেকে ১২টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত অধ্যক্ষকে তাঁর দপ্তরে অবরুদ্ধ করে রাখেন। যাঁরা অধ্যক্ষকে অবরুদ্ধ করেছেন, তাঁদের মধ্যে কলেজের নজরুল হলের আবাসিক শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় ধর্মপুরের কিছু বাসিন্দা ছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ১ মিনিট ৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায় অধ্যক্ষকে শাসাচ্ছেন কয়েকজন ব্যক্তি। অধ্যক্ষ তাঁর দপ্তর থেকে বের হতে চাইলে তাঁকে চেয়ারে বসতে বাধ্য করেন তাঁরা। একপর্যায়ে তাঁরা বলতে থাকেন, ‘আপনি সমাধান না দিয়ে বের হতে পারবেন না।’ পাশে থাকা উপাধ্যক্ষ মো. আবদুল মজিদ বলেন, ‘আমাদের কাজ আছে।’ এ সময় শিক্ষক পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক বাংলা বিভাগের প্রভাষক মো. মুনছুর হেল্লাল ও প্রধান সহকারী মাজহারুল ইসলামকে উত্তেজিতদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। একপর্যায়ে অধ্যক্ষ বলেন, ‘কলেজের মসজিদ, মসজিদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত কলেজ নেবে।’ এ সময় পেছনে থাকা একজন অধ্যক্ষকে ধমক দিয়ে বলেন, ‘মসজিদের বিষয়ে কলেজ সিদ্ধান্ত নেবে মানে?’ অধ্যক্ষ এক পর্যায়ে ধমক দিয়ে বলেন, ‘এখানে কে কথা বলছে?’ পেছন থেকে উচ্চ শব্দে একজন বলে ওঠেন, ‘আমরা কথা বলছি।’

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, যাঁরা অধ্যক্ষকে তাঁর দপ্তরে অবরুদ্ধ করেছেন, তাঁরাই এসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন। উত্তেজিত লোকজন যখন ঝামেলা বেশি করতে চেয়েছিলেন, তখন অধ্যক্ষ আবারও কক্ষ ত্যাগের চেষ্টা করলে তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। একপর্যায়ে তালিম চালু রাখার বিষয়ে ‘আপনাদের যা ইচ্ছা করেন’—এ কথা বলে দপ্তর থেকে বের হন অধ্যক্ষ।

ধর্মপুর এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, ‘এখানে তাবলিগ জামাতের কোনো দলাদলি নেই। কলেজের কয়েকজন শিক্ষক সাদ পক্ষের। তারা পেছনে থেকে এসব করাচ্ছে। এর আগে কোনো অধ্যক্ষ মসজিদে দাওয়াতি কাজ বন্ধ করেনি। এখানে প্রায় সময় এশার নামাজের পর ধর্মীয় আলোচনা হয়। আমরা চাই এটা অব্যাহত থাকুক।’

জানতে চাইলে অধ্যক্ষ মো. আবুল বাশার ভূঞা বলেন, ‘মসজিদটি কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরে এবং কলেজের মসজিদ। বাইরের মানুষ এখানে নামাজ পড়ে, আমরা কখনোই কাউকে বাধা দিইনি। কিছুদিন আগে ঢাকায় তাবলিগের দুই পক্ষের ঝামেলার পর থেকে আমরা চেষ্টা করছি এসব বিষয়ে সতর্ক থাকার। ৪–৫ দিন আগে মাওলানা সাদের অনুসারীরা কলেজের মসজিদে তাবলিগের তালিম করছিল। তখন মাওলানা জুবায়েরের অনুসারীরা তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে আমাদের এক শিক্ষার্থীও আহত হয়েছে। তাই আমরা নিরাপত্তার স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিয়েছি কলেজের মসজিদে কোনো পক্ষেরই তাবলিগের তালিম কার্যক্রম চলবে না। এতে আমাদের কিছু শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় একটি পক্ষ আজকে এই ঘটনা ঘটিয়েছে।’

অধ্যক্ষ বলেন, ‘যারা আজকে এই ঘটনায় ছিল, তাদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। আগামীকাল বুধবার একাডেমিক কাউন্সিলের সভা হবে। সেখানে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে এই বিষয়েও আলোচনা হবে। এরপর আমরা বিষয়টি নিয়ে আইনগত সিদ্ধান্ত নেব।’

কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি এখনো আমাদের জানায়নি কলেজ কর্তৃপক্ষ। তারা এ নিয়ে অভিযোগ করলে আমরা ঘটনাটি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব। এ ছাড়া বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছি।’