সুন্দরবনে বেড়েছে বাঘের পদচারণা

সুন্দরবনে বাঘ | ফাইল ছবি

রিয়াদ ইসলাম, খুলনা থেকে ফিরে:  সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে আবারও দৃশ্যমান হচ্ছে বাঘের চলাচল। বনে থাকা বনকর্মীরা এবং বনে ঘুরতে যাওয়া পর্যটকেরা প্রায়ই বাঘ দেখতে পাচ্ছেন। বনজীবী ও বনরক্ষীরা জানিয়েছেন, গত ১০ বছরে এভাবে বনে বাঘের চলাচল লক্ষ করেননি তাঁরা।

সুন্দরবনের পাটকোষ্টা টহল ফাঁড়ির ফরেস্ট গার্ড মিজানুর রহমান  বলেন, এখন প্রায় রাতেই টহল ফাঁড়ির পেছনের পুকুরের দিক থেকে বাঘের গর্জন ভেসে আসে। একাধিকবার তাঁরা বাঘের পায়ের ছাপও দেখেছেন। সাধারণত ওই পুকুরে পানি পান করতে আসে বাঘ। তবে পানি পান করে বাঘ আবার বনের গাছপালা আচ্ছাদিত জঙ্গলে চলে যায়।

সর্বশেষ ৩ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টার দিকে ‘এমভি ক্রাউন’ নামে পর্যটকবাহী একটি লঞ্চ সুন্দরবনের কটকা খালে প্রবেশ করলে একটি বাঘ সাঁতরে নদী পার হতে দেখেন পর্যটকেরা। ওই দিন বিকেলে সুন্দরবনের আলীবান্দা এলাকায় দায়িত্বরত বনরক্ষীরা আরও একটি বাঘকে নদী সাঁতরে বনের ভেতর প্রবেশ করতে দেখেন। এর আগের দিন ২ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টার দিকে ‘এমভি বন সাম্পান’ নামের আরেকটি পর্যটকবাহী জাহাজের পর্যটকেরা সুন্দরবনের কচিখালী নদীতে আরও একটি বাঘ সাঁতরে যাওয়ার বিরল দৃশ্য দেখেন। পৃথক তিনটি স্থানে বাঘ দেখার দৃশ্যের ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন পর্যটক ও বনরক্ষীরা।

সুন্দরবনের কচিখালী অভয়ারণ্য কার্যালয়ের বনরক্ষী মোস্তাক আহমেদ বলেন, ‘গত ৮ আগস্ট সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমাদের অফিসের বাইরে একটি বাঘ দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ বাঘটি দেখে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। ভয়ে ভয়ে মুঠোফোন দিয়ে বাঘের ভিডিও করতে থাকি। কিছুক্ষণ পরে বাঘটি বনের দিকে চলে যায়।’

সুন্দরবনে হঠাৎ দেখা বাঘ | ফাইল ছবি

সুন্দরবনের চান্দেশ্বর টহল ফাঁড়ির ইনচার্জ ফারুক হোসেন জানান, গত ৩ ফেব্রুয়ারি তাঁদের ফাঁড়ির পুকুরপাড়ে দুটি বাঘ দেখে ভয় পেয়ে বনরক্ষীরা দ্রুত ঘরের মধ্যে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। বাঘ দুটি পুকুরে নেমে পানি পান শেষে কিছু সময় পুকুরপাড়ে বিশ্রাম নেয়। পরে সামান্য পথ ঘুরে এসে অবস্থান নেয় তাঁদের রান্নাঘরের পাশে। পরে আরও একটি বাঘ সেখানে যোগ দেয়। ওই দৃশ্যের ছবি ধারণ করতে গিয়ে তাঁদের হাত-পা কাঁপছিল বলে জানান ফারুক হোসেন।

বন বিভাগের কর্মী মো. মিজানুর রহমান বলেন, গত ৬ ফেব্রুয়ারি সারা রাত ২টি বাঘ সুন্দরবনের শরবতখালী বন টহল ফাঁড়ির পাশে ছিল। ওই রাতে আতঙ্কে তাঁদের চারজন বনরক্ষীর একজনও ঘুমাতে পারেননি। সারা রাত ধরে চলে দুই বাঘের গর্জন।

এ ছাড়া গত বছর ২৫ ফেব্রুয়ারি বন বিভাগের কর্মী মুফিজুর রহমান কটকার কাছাকাছি দুটি বাচ্চাসহ মা বাঘ দেখতে পান। ১২ মার্চ বনের ছিটা কটকা এলাকায় একসঙ্গে চারটি বাঘ দেখতে পান পর্যটকেরা। ৩০ মার্চ নুয়ে পড়া গাছের ওপর একটি বাঘের বাচ্চা দেখেন পর্যটকেরা।

সুন্দরবনের নীলকমল অভয়ারণ্য কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘বেশ কিছু দিন আগে মধ্য দুপুরে টহল শেষে আমিসহ কয়েকজন বনরক্ষী বন অফিসে ফিরছিলাম। সুন্দরবনের ছিছখালী খালের মাথায় পৌঁছালে খাল পাড়ে একটি বাঘের শাবককে দেখে আমাদের চোখ আটকে যায়। বাঘ শাবকটি খালের পাড় ধরে দ্রুতগতিতে বনের মধ্যে চলে যায়। তার কিছুক্ষণ পর আমরা সেখানে গিয়ে মা বাঘের পায়ের ছাপও দেখতে পেয়েছি।’ তিনি বলেন, গত ১০ বছরে এভাবে বনে বাঘের চলাচল লক্ষ করা যায়নি। সুন্দরবন বনদস্যু মুক্ত হওয়ার পর, চোরা শিকার বন্ধে স্মার্ট প্যাট্রোলিং চালুসহ বনরক্ষীদের নিয়মিত টহলের কারণে বাঘের সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করছেন তিনি।

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো বলেন, গত ৩০ এপ্রিল পশ্চিম বন বিভাগের আওতাধীন খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে বাঘশুমারির কাজ শেষ হয়েছে। আগামী নভেম্বর থেকে বনের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জে একই পদ্ধতিতে বাঘশুমারি করা হবে। প্রতিটি রেঞ্জের ১৪৫টি পয়েন্টে দুটি করে ক্যামেরা স্থাপন করা হবে, যা থাকবে ৪০ দিন। ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে পাওয়া ছবি এবং বাঘের পায়ের ছাপ ঢাকায় ল্যাবে পর্যালোচনা করা হবে। এরপর ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই বাঘ দিবসে বাঘশুমারির ফল প্রকাশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি জানান, ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বাঘের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এমনকি বাঘের প্রধান শিকার চিত্রা হরিণ ও বন্য শূকরের সংখ্যাও বেড়েছে।

গত কয়েকবারের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাঘ গণনার ফলাফলে দেখা যায়, ২০০৪ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি ও বন বিভাগের যৌথ শুমারিতে বাঘের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৪০টি তে। ২০১৩ সালের জরিপে বাঘের সংখ্যা হয় ১০৬টি। আর ২০১৮ সালের সর্বশেষ ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে করা শুমারি অনুযায়ী সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ১১৪টি।