চাঁপাইনবাবগঞ্জে মুচলেকার পরদিনই গোপনে বাল্যবিবাহ
বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার বেশি এমন জেলাগুলোর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ অন্যতম। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৮ বছরের আগে মেয়েদের বিয়ের হার ৬২ শতাংশ।
‘পারিবারিকভাবে অভিভাবক ও আত্মীয়স্বজনের সম্মতিতেই এই বিয়ে হয়েছে। আইন সম্পর্কে জানতাম, তারপরও পারিবারিক সিদ্ধান্তে বিয়েটি করেছি। বয়স পূর্ণ হলে তা নিবন্ধন করা হবে।’ কথাগুলো বলছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে যেখানে শিক্ষকদের অগ্রণী ভূমিকা রাখার কথা, সেখানে তিনি নিজেই নিজের বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীকে বিয়ে করেছেন। উল্টো প্রশ্ন তুলে এই শিক্ষক বলেন, ‘অনেকেই তো এভাবে বিয়ে করছে। আমি করেছি, তাতে দোষের কী?’
বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার বেশি এমন জেলাগুলোর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ অন্যতম। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৮ বছরের আগে মেয়েদের বিয়ের হার ৬২ শতাংশ। শিশু অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা না থাকায় জেলায় বাল্যবিবাহের প্রবণতা বাড়ছে।
জেলা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর, সমাজসেবা অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত জেলার পাঁচ উপজেলায় অন্তত ১৬টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করা হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, বন্ধ হওয়া বেশির ভাগ বিয়েই পরে গোপনে সম্পন্ন হয়েছে। অথচ এ জন্য কাউকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসন শুধু মুচলেকা নিয়েই দায়িত্ব শেষ করছে। গোমস্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাকির মুন্সী জানান, চলতি বছর বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ অভিযানে কারও বিরুদ্ধে জেল বা জরিমানার কোনো রেকর্ড নেই।
অথচ বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী নারী এবং ২১ বছরের কম বয়সী পুরুষের বিয়ে অবৈধ। এই আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বাল্যবিবাহ করলে বা এতে জড়িত থাকলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, অথবা ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা, কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
বাস্তব চিত্র অবশ্য ভিন্ন। গত ৩১ মে গোমস্তাপুরের এক স্কুলছাত্রীর বিয়ের আয়োজন বন্ধ করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। মেয়ের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে বিয়ে না দেওয়ার শর্তে মা-বাবার কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়া হয়। কিন্তু পরদিনই গোপনে বিয়েটি সম্পন্ন হয়। বর বলেন, ‘বাল্যবিবাহ আইনত অপরাধ জেনেও বিয়েটি করেছি।’ অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলার পাঁচ উপজেলাতেই নিয়মিত এমন ঘটনা ঘটছে। প্রশাসন বিয়ে বন্ধ করে মুচলেকা নিলেও কিছুদিন পর গোপনে তা সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গোপনে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর প্রমাণ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় কনেকে বাবার বাড়ি বা বরের বাড়ি—কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। পরিবারগুলোও বিয়ের বিষয়টি অস্বীকার করে। ফলে মামলা বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় আইনি জটিলতা তৈরি হয়।
জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ এন এম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, ‘অভিযোগ পেলে পুলিশ তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে গোপনে বিয়ে সম্পন্ন হওয়া এবং পরিবারগুলোর অস্বীকার করার কারণে প্রমাণ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আসলাম-উদ-দৌলা বলেন, ‘বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে শুধু তাৎক্ষণিক অভিযান যথেষ্ট নয়। এরপর নিয়মিত নজরদারি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। সামাজিক বাস্তবতা ও মেয়েদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে আরও সংস্কার আনা প্রয়োজন।’